জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে ক্রিকেটে আসেন দেশের অসংখ্য নারী। কেউ আসেন একাডেমি থেকে, জেলা পর্যায়ে খেলে কেউবা বয়সভিত্তিক দলের সিঁড়ি পেরিয়ে পা রাখেন জাতীয় দলের আঙিনায়। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বে থাকা অনেক কোচ, নির্বাচক এবং দলের বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে নারী ক্রিকেটারদের অনৈতিক প্রস্তাব, আর সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেই নানা ধরনের হয়রানি। এমনকি ধ্বংস করে দেয়া হয় পুরো ক্যারিয়ার!
খুলনায় কোচ ইমতিয়াজ হোসেন পিলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ
দেশের নারী ক্রিকেটে এমনই ভয়াবহ অভিযোগ সামনে এনেছে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য হুইসেল। তাদের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের শুরুতেই উঠে আসে খুলনার নারী ক্রিকেটের কোচ ইমতিয়াজ হোসেন পিলুর নাম। অভিযোগকারীদের দাবি, হোটেলকক্ষ থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুম ও অনুশীলন মাঠ—বিভিন্ন জায়গায় অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, জোর করে জড়িয়ে ধরা, চুমু দেয়ার চেষ্টা এবং কুপ্রস্তাবের শিকার হয়েছেন পিলুর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসা অনেক নারী ক্রিকেটার।
এমনকি প্রতিনিয়ত এসব ঘটনা ঘটলেও ভয়ের কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেন না বলে দাবি করেছেন পিলুর সাবেক সহকারী কোচ রেশমা আক্তার আদুরি।
এসব পরিস্থিতি এড়াতে কেউ কেউ ক্রিকেটই ছেড়ে দেন বলে তুলে ধরা হয়েছে দ্য হুইসেলের এই প্রতিবেদনে।
পিলুর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে আসা নারী ক্রিকেটারদের জড়িয়ে ধরার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এমন কিছু অভিযোগ রয়েছে বলে স্বীকার করেন পিলু। তবে এসব অভিযোগের প্রমাণ দাবি করেন তিনি।
ঢাকায় রুহুল আমিন ও সাইফুল ইসলাম খোকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
খুলনার গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকার নারী ক্রিকেটেও একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে দ্য হুইসেলের ওই প্রতিবেদনে। এবার অভিযোগের কেন্দ্রে ঢাকার নারী ক্রিকেটের প্রভাবশালী কোচ রুহুল আমিন। খেলাঘরের মাঠ, ক্লাব ক্রিকেট কিংবা বিসিবির ক্যাম্প—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর দাপট সমান্তরালে বিস্তৃত।
দ্য হুইসেলের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রভাব ও দাপটকে কেন্দ্র করেই রুহুল আমিন গড়ে তোলেন মেয়েদের ওপর যৌন নিপীড়নের এক অন্ধকার সাম্রাজ্য। তাঁর কাছে অনুশীলন করতে আসা এক নারী ক্রিকেটারের অভিযোগ, ২০২০ সালের শুরুর দিকে নিজ কক্ষে মেয়েটিকে একা পেয়ে তাঁর বুকে স্পর্শ করার অপচেষ্টা করেন রুহুল আমিন।
তবে, দ্য হুইসেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রুহুল আমিন। সেইসঙ্গে দ্য হুইসেলের ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও কিছু লোমহর্ষক তথ্য। অভিযোগের তীর শুধু রুহুলের দিকেই নয়, বরং গুরু গেছেন যে পথে, শিষ্যও গেছেন সেই পথেই। দ্য হুইসেলের তথ্য অনুসারে, রুহুলের সাবেক সহকারী কোচ সাইফুল ইসলাম খোকনের বিরুদ্ধেও উঠে এসেছে একই ধরনের অভিযোগ। জানা যায়, খেলাঘরে আট বছর সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পুলিশ দলের প্রথম বিভাগে খেলার সুযোগ করে দেয়ার কথা বলে সাইফুল মেয়েদের কাছে শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী।
দ্য হুইসেলের দাবি, প্রস্তাবে রাজি হওয়ার জন্য মেয়েদের থাকা-খাওয়ার খরচ বহনের আশ্বাস দিতেন খেলাঘরের সাবেক এই সহকারী কোচ। এমনকি তাঁর প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নানা ধরনের হয়রানি ও অপমানের শিকার হতে হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সাইফুল ইসলাম খোকন অস্বীকার করেছেন বলে দ্য হুইসেলে উল্লেখ করা হয়।
সাবেক নির্বাচক সজল আহমেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ
অন্যদিকে অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনে অভিযোগের তীর ছোড়া হয়েছে বিসিবির সাবেক নির্বাচক ও বয়সভিত্তিক দলের ম্যানেজার সজল আহমেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধেও। খাদিজা আক্তার লামিয়া নামের ১৭ বছর বয়সী এক মেয়ের অভিযোগ, সজল তাঁকে লাইফ সেটেল এবং বিশ্বকাপ খেলানোর প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। তবে লামিয়া তাঁর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
এদিকে লামিয়া এই অনৈতিক প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার কারণে পরবর্তী সময়ে সজল তাঁকে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে দ্য হুইসেলের প্রতিবেদনে প্রকাশ করা একটি ছবিতেও উঠে এসেছে এক নারীকে দিয়ে সজলের মাসাজ করানোর অপ্রীতিকর মুহূর্ত।
জাতীয় পর্যায়ে মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে অভিযোগ
এদিকে অভিযোগের তীর শুধু তৃণমূলকে ঘিরেই নয়, বরং ক্লাব কিংবা জেলার গণ্ডি পেরিয়ে তা পৌঁছে গেছে জাতীয় পর্যায়ে। সবশেষে অভিযোগের কাঠগড়ায় সাবেক নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু।
মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের অভিজ্ঞ পেসার জাহানারা আলম। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত এই ক্রিকেটার, এক সাক্ষাৎকারে কান্নাজড়িত কণ্ঠে অশালীন আচরণ, অনৈতিক প্রস্তাব এবং নানাভাবে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন মঞ্জুর বিরুদ্ধে।
জাহানারার এই অভিযোগের পর ওই বছরই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তারিক উল হাকিমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এমনকি তদন্তে মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অশালীন আচরণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও পেয়েছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু সময় গড়িয়েছে, আর সময়ের পরিক্রমায় অন্য নানা ইস্যুর আড়ালে চাপা পড়ে গেছে সেই ঘটনা। অথচ মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলেই জানা যায়।
তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় দলের ক্রিকেট—প্রতিটি পর্যায়েই যেন নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন। দেশের নারী ক্রিকেটের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একের পর এক এমন অভিযোগ সামনে আসায় তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, রয়েছে এমন ক্ষোভও। তাই অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তে নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি নারী ক্রিকেটারদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই জরুরী বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।
আরও পড়ুন:







