শুক্রবার

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৮ কার্তিক, ১৪৩৩

ফ্রী’তে খেলা দেখার সুযোগ; তবুও দর্শক খরা ক্রিকেটে?

নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪৮

শেয়ার

ফ্রী’তে খেলা দেখার সুযোগ; তবুও দর্শক খরা ক্রিকেটে?
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

একসময় যে ক্রিকেট দলকে ঘিরে কোটি মানুষের স্বপ্ন ছিল, সেই বাংলাদেশ ক্রিকেটই এখন যেন হতাশার আরেক নাম। বড় দলের বিপক্ষে লড়াইয়ের প্রত্যাশা তো দূরের কথা, জিম্বাবুয়ে কিংবা আফগানিস্তানের মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও অসহায় আত্মসমর্পণ। ধারাবাহিক ব্যর্থতা, মাঠের বাইরে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, আর ব্যক্তিগত অর্জনের আত্মপ্রচার, সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের ক্রিকেট আসলে কোন পথে হাঁটছে?

অবকাঠামো বাড়লেও সাফল্য কোথায়

গত দেড় দশকে ক্রিকেটের অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা ও বাণিজ্যিক পরিসর বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক সাফল্য কোথায়? বরং তামিম ইকবাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হওয়ার পর থেকেই যেন, খারাপ সময় বেশি কাটাচ্ছে ক্রিকেট দল। সাম্প্রতিক সময়ে, আরব আমিরাত সফরে জিম্বাবুয়ের কাছে ৯৯ রানে হার, এরপর আফগানিস্তানের বিপক্ষে পরাজয়, সব মিলিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজে ফাইনালে ওঠার আগেই বিদায় নেয় বাংলাদেশ। তবে, এই টুর্নামেন্টে শুধু হার নয়, প্রশ্ন উঠেছে হারের ধরন এবং ক্রিকেটারদের মানসিকতা নিয়েও।

গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে শপিং বিতর্ক

আফগানিস্তানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগের রাতেও বাংলাদেশ দলের কয়েকজন ক্রিকেটারের শপিংয়ে যাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। সূত্রের দাবি অনুযায়ী, কেউ কেউ গিয়েছিলেন স্বর্ণের দোকানেও। অন্য একটি দল হোটেল থেকে প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার দূরের রেস্তোরাঁয় খাবার আনতে গিয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এসব তথ্য নিয়ে ক্রিকেটবিষয়ক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রশ্ন উঠেছে, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে ক্রিকেটারদের প্রস্তুতি ও পেশাদারত্বের অগ্রাধিকার আসলে কোথায়?

একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি টিম ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অনেকেই। ক্রীড়া সাংবাদিক আবু সাদাত, ক্রিকেটারদের শপিংকাণ্ডের জন্য দায়ী করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ম্যানেজার ও বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবালের ভাই নাফিস ইকবালকে। সাদাত, এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তোলেন, আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাঁচা-মরার ম্যাচের আগে নাফিস ইকবাল কেন ক্রিকেটারদের শপিংয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেন? তা নিয়ে। বোর্ড সভাপতির ভাই বলে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে কেন থাকবেন নাফিস? তাও আলোচনায় নিয়ে আসেন সাদাত।

ব্যক্তিগত অর্জন বনাম দলীয় দায়বদ্ধতা

তবে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সংকট কি শুধু মাঠের বাইরের এসব কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ? তা নয়। কারণ, ত্রিদেশীয় সিরিজে দলের ব্যর্থতার পরদিন নিজের ফেসবুক পেজে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স তুলে ধরেন পেসার তাসকিন আহমেদ। দুই ম্যাচে সামান্য পাঁচ উইকেট নেয়ার পর নিজের পারফরম্যান্সকে প্রশংসনীয় হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান অবশ্যই একজন ক্রিকেটারের মূল্যায়নের অংশ। কিন্তু, দল যখন ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ, তখন ব্যক্তিগত অর্জনের প্রচার কতটা সংবেদনশীল, সেই প্রশ্ন তুলেছে সমর্থকদের অনেকে। কারণ ক্রিকেট কোনো একক ব্যক্তির সাফল্যের মঞ্চ নয়। এখানে একজনের পাঁচ উইকেটও দলের পরাজয় ঠেকাতে না পারলে শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে সম্মিলিত ব্যর্থতাই।

এর বিপরীতে, নজির আছে হাতের সামনেই। ইংল্যান্ডের ওয়ানডে অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। সম্প্রতি, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে, ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরি করার মতো অসাধারণ ইনিংস খেলেও, ম্যাচ হারের পর, ব্যক্তিগত অর্জনকে বড় করে দেখেননি তিনি। ম্যাচ শেষে দেয়া তার বক্তব্যের মূল কথা, দল হারলে ব্যক্তিগত সাফল্যের আনন্দও ম্লান হয়ে যায়।

দুই ক্রিকেটারের পরিস্থিতি এক নয়, পারফরম্যান্সের প্রেক্ষাপটও আলাদা। তবু এই দুই উদাহরণ সামনে আনে একটি মৌলিক প্রশ্ন, একজন ক্রিকেটারের কাছে ব্যক্তিগত অর্জন বড়, নাকি দলের সাফল্য? বিশ্বমানের ক্রিকেটাররা জানে, রেকর্ড মানুষকে পরিচিতি দেয়; কিন্তু দলের হয়ে জয় এনে দেয়ার সামর্থ্যই শেষ পর্যন্ত একজন খেলোয়াড়ের প্রকৃত মূল্যায়ন তৈরি করে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে এই দলীয় দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি কতটা শক্তিশালী, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিজ্ঞাপনের শুটিং, প্রচারণামূলক অনুষ্ঠান কিংবা বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু, যখন মাঠের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিক অবনতি দেখা যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, ক্রিকেটারদের মূল দায়িত্বের সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের ভারসাম্য কতটা বজায় থাকছে?

বিনা মূল্যে খেলা দেখার সুযোগেও দর্শক টানার চ্যালেঞ্জ

এদিকে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের আগ্রহ নিয়েও তৈরি হয়েছে আলোচনা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আসন্ন টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচে মিরপুরের উত্তর ও দক্ষিণ গ্যালারিতে বিনা মূল্যে খেলা দেখার সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বুধবার (২৮ অক্টোবর) থেকে শুরু হতে যাওয়া এই টেস্টের পাঁচ দিনের জন্যই থাকছে এই সুবিধা।

দর্শকদের জন্য এমন উদ্যোগ ইতিবাচক হতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, ক্রিকেটের প্রতি মানুষের আগ্রহ ধরে রাখতে কি শুধু বিনা মূল্যে টিকিট দিলেই হবে? দর্শক মাঠে আসে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট দেখতে, প্রিয় দলের লড়াই দেখতে, শেষ পর্যন্ত জয়ের আশা নিয়ে বসে থাকতে। সেই প্রত্যাশা বারবার ভেঙে গেলে গ্যালারিতে দর্শক ফেরানোর চ্যালেঞ্জও বাড়ে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ধারাবাহিক ব্যর্থতায় প্রবল আগ্রহের ক্রিকেটেও এখন বিনামূল্যের টিকিটে দর্শক টানার কৌশল নিতে হয়, তামিমের বর্তমান ক্রিকেট বোর্ডকে।

দল নির্বাচন ও ক্রিকেট সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার ইমরুল কায়েসও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দল নির্বাচন ও দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার প্রশ্নগুলো সামনে আনে আরও বড় কিছু বিষয়, জাতীয় দলে খেলোয়াড় নির্বাচনের মানদণ্ড কী? ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে? ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়ায় কোথায় ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে?

এছাড়া, সাবেক এই ক্রিকেটার উল্লেখ করেন, শুধু একজন কোচ কিংবা কয়েকজন ক্রিকেটারকে দায়ী করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সঠিকভাবে দল নির্বাচন, উন্নত ঘরোয়া ক্রিকেট সংস্কৃতি, কার্যকরি প্রশিক্ষণ, ফিটনেস, মানসিক প্রস্তুতি ও টিম ম্যানেজমেন্ট, সবকিছুর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। একইভাবে, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নেয়া উচিৎ বলেও মনে করেন ইমরুল কায়েস।

সবমিলিয়ে, বিশেষজ্ঞদের মতে ক্রিকেটে বিজ্ঞাপন থাকবে, ব্যক্তিগত রেকর্ডও থাকবে। থাকবে তারকাখ্যাতি আর বাণিজ্যিক ব্যস্ততাও। কিন্তু এসবের কোনোটিই জাতীয় দলের সাফল্যের বিকল্প হতে পারে না। কারণ সমর্থকরা শুধু পরিসংখ্যান দেখতে চায় না। বাংলাদেশের জয় কিংবা ভালো ক্রিকেটের পাশাপাশি শেষ বল পর্যন্ত লড়াইও দেখতে চায় তারা। আর সেই লড়াই ফিরিয়ে আনতে না পারলে, বিনা টিকিটে গ্যালারিতে দর্শক ফেরানোর চেয়েও, বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।