সোমবার

১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৪ কার্তিক, ১৪৩৩

ফর্ম থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রিকেটারদের শেষটা কেনো এতো নির্মম?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:৫৫

আপডেট: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:৫৭

শেয়ার

ফর্ম থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় ক্রিকেটারদের শেষটা কেনো এতো নির্মম?
ছবি সংগৃহীত

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড, কোটি কোটি ভক্তের উন্মাদনা আর হাজার হাজার কোটি টাকার নিয়মিত আয়োজন। আপাতদৃষ্টিতে ভারতীয় ক্রিকেটকে রূপকথার মতো মনে হলেও, এর আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম ও অন্ধকার সত্য।

বিশ্বসেরা পারফর্ম করার পরও যে দেশে ক্রিকেটারদের টিকে থাকার নিশ্চয়তা নেই- ফর্ম থাকা সত্ত্বেও বিদায় নিতে হয় অবমূল্যায়নের শিকার হয়ে; সেখানে ক্রিকেট কি শুধুই একটি খেলা, নাকি এক চরম মানসিক কারাগার? কেন বারবার ভারতীয় তারকাদের শেষটা হয় এতটা হৃদয়বিদারক?

সূর্যকুমার যাদবের বিশ্বজয়ের পর বাদ পড়া

নতুন করে, ঘটনার শুরু ২০২৬ সালের মার্চে। ভারতকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দেয়া সফল অধিনায়ক সূর্যকুমার ইয়াদাভ। সর্বশেষ টুর্নামেন্টে ২৪২ রান আর ১৩৬.৭২ স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করে, দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে ভূমিকা রেখেছেন সামনে থেকে।

কিন্তু ট্রফি উদযাপনের রেশ কাটতে না কাটতেই নজিরবিহীন এক ইতিহাস। অবসর না নেয়া সত্ত্বেও, বিশ্বজয়ী অধিনায়ককে পরের সিরিজ থেকেই ছেঁটে ফেলল ভারতীয় নির্বাচক কমিটি। প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর যাকে কেবল একটি কঠিন সিদ্ধান্ত বলে দায় সারলেন, আর নেতৃত্বের দায়ভার তুলে দিলেন শ্রেয়স আইয়ারের হাতে।

এই চরম অবমূল্যায়নের পর আকাশ চোপড়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ভেতরের যন্ত্রণার কথা ব্যক্ত করে সূর্যকুমার ইয়াদাভ বলেন, দল থেকে বাদ পড়ার পর টানা ৪০ থেকে ৫০ দিন তিনি ঘরে অলস বসে ছিলেন। চরম আঘাত পেয়েছেন বলেও জানান। ওই সময় নানাবিধ চিন্তার মধ্যে, খেলা চালিয়ে নিবেন নাকি অবসরে যাবেন, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিলেন এই ক্রিকেটার।

যে অধিনায়ক দলকে বিশ্বসেরার সম্মান এনে দিয়েছেন, তাকেই কত সহজে ছুঁড়ে ফেলা হলো দল থেকে। এরপর এই প্রশ্ন তুলে বিসিসিআইকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে অনেকেই।

কিংবদন্তিদের সম্মানজনক বিদায়ের অভাব

তবে, সূর্যকুমার একা নন। বিসিসিআই-এর নীতিই যেন এমন। তারা তাদের অনেক সফল ক্রিকেটারকেই, সম্মানজনকভাবে বিদায় দেয়নি। অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা যখন হোম গ্রাউন্ডে হাজার হাজার দর্শকের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মাঠ থেকে বিদায় নেয়, সেখানে ভারতীয় লিজেন্ডদের কপালে জোটে এক টুকরো সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা নির্জন সংবাদ সম্মেলন।

এম এস ধোনি ২০১৯ বিশ্বকাপের পর নীরবে সরে যান এবং ২০২০ সালে ইনস্টাগ্রামের এক ছোট ভিডিওবার্তায় ইতি টানেন নিজের রঙিন ক্যারিয়ারের।

এছাড়া, প্রচুর সম্ভাবনা ও পারফরম্যান্স করার পরও, দল থেকে বাদ পড়ে পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে নীরবে বিদায় নিতে হয়েছে রাহুল দ্রাবিড়, বীরেন্দ্র সেহওয়াগ ও জাহির খানের মতো কিংবদন্তিদের। ভারতের দুটি বিশ্বকাপ জয়ের প্রধান দুই নায়ক, যুবরাজ সিং ও গৌতম গম্ভীরও পাননি কোনো বিদায়ী ম্যাচ।

একই নিয়তির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ভিভিএস লক্ষ্মণ, হরভজন সিং থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের সুরেশ রায়না, শিখর ধাওয়ান, আম্বাতি রাইডু, চেতেশ্বর পূজারা কিংবা রবীচন্দ্রন অশ্বিনের ক্ষেত্রেও।

ক্রিকেট ইতিহাসে কেবল শচীন টেন্ডুলকর এবং আশিস নেহরা, এই দুজনকে ছাড়া আর কোনো ভারতীয় ক্রিকেটারকে অফিশিয়াল ফেয়ারওয়েল ম্যাচ দেয়নি বিসিসিআই।

মানসিক বিষণ্ণতায় জর্জরিত ক্রিকেটাররা

দলে জায়গা হারানোর এই চরম অনিশ্চয়তা এবং বিসিসিআই-এর বিতর্কিত সব সিদ্ধান্ত ক্রিকেটারদের ঠেলে দিচ্ছে তীব্র মানসিক বিষণ্ণতার দিকে। যা আলোচনাতেও এসেছে।

সাবেক ভারতীয় পেসার প্রাভীন কুমার নিজেই খোলসা করেছিলেন, দল থেকে বাদ পড়া ও আইপিএল চুক্তি হারানোর পর ২০১৯ সালে তিনি মারাত্মক বিষন্নতায় ভোগেন এবং আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন।

বিশ্বকাপজয়ী সাবেক ব্যাটার রবিন উথাপ্পা এবং সাবেক আরেক ক্রিকেটার দোড্ডা গণেশ বা আশুতোষ শর্মার মতো তারকাদেরও অগোচরে যেতে হয়েছে চরম বিষন্নতার মধ্য দিয়ে।

এমনকি বিরাট কোহলি ও তরুণ আর্যমান বিড়লার মতো ক্রিকেটাররাও ক্রিকেট থেকে লম্বা বিরতি নিতে বাধ্য হয়েছিলেন মানসিক ক্লান্তির কারণে। সমালোচনা রয়েছে, বাণিজ্যিক কারণে তরুণ ক্রিকেটারদের বেশি সুযোগ করে দিতে, অনেক সময় অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সাথে করা হচ্ছে অন্যায় আচরণ। ফর্মে থাকা সত্ত্বেও ছেটে ফেলা হচ্ছে অনেক সফল ক্রিকেটারকেও।

কিশোরী ক্রিকেটারের জীবননাশ

কিন্তু, এই নির্মম সংস্কৃতি বা ধারার সবচেয়ে করুণ বলি হতে হলো ১৭ বছরের এক কিশোরীকে। নাগপুরের নারী ক্রিকেটার অদিতি চৌকাণ্ডে, যিনি বিগত দুই বছর ধরে বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের ভিসিএ দলে জায়গা করে নেয়ার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করছিলেন। সুযোগ না পেয়ে চরম মানসিক চাপে পড়ে ওই নারী ক্রিকেটার শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনটাই শেষ করে দিয়েছেন। করেছেন আত্মহত্যা।

তার আত্মহত্যার নোটে লেখা ছিল মাত্র কয়েকটি হৃদয়বিদারক শব্দ, আই ওয়াজ নট সিলেক্টেড বা আমার সুযোগ হয়নি। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই ঝরে গেল একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ।

যাঁরা দেশের জন্য জীবনের একটা বড় সময় উৎসর্গ করছেন, তাঁদের শেষ পরিণতি যদি হয় এমন অবহেলা আর মানসিক যন্ত্রণাময়, তবে তা ভারতীয় ক্রিকেটের অন্তরালের অন্ধকারকেই যেন সামনে নিয়ে আসে। ক্রিকেটারদের সম্মান দিতে না পারা আর অতিরিক্ত বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার নামে এই মানসিক নির্যাতন, ভারত কি আদৌ ক্রিকেটের উপকার করছে নাকি ক্ষতি? জোরালো হচ্ছে সেই প্রশ্ন।