বুধবার

৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২ আশ্বিন, ১৪৩৩

শেষ হলো মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় বিদায়ে অশ্রুসিক্ত আর্জেন্টিনা

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:১৯

শেয়ার

শেষ হলো মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় বিদায়ে অশ্রুসিক্ত আর্জেন্টিনা
ছবি সংগৃহীত

লিওনেল মেসি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি, অসংখ্য রূপকথার জীবন্ত কারিগর। যে বাঁ-পায়ের জাদুতে থমকে গেছে বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডাররা, সেই পা-ই অবশেষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো স্পর্শ করলো জাতীয় দলের মাঠ।

বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম, গ্যালারিতে ৮৫ হাজারেরও বেশি দর্শক। ঠিক তার সামনেই আর্জেন্টিনা আর বেনিন মুখোমুখি দাঁড়ানো। আর মাঝে এক কিংবদন্তির জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক অধ্যায়। অনেকের কাছে এই ফুটবল কিংবদন্তির শেষ ম্যাচটাও ছিল মেসিময়।

মেসির শেষ ম্যাচ

ম্যাচটিতে ৩-০ গোলে বেনিনের বিপক্ষে জিতেছে আর্জেন্টিনা। আর এই তিনটি গোলেই সরাসরি অবদান ছিল ফুটবল ইতিহাসের এই অনন্য মহাতারকার। ৪৮ মিনিটে কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দির গোলের মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। সেই সঙ্গে ৬১ মিনিটে নিকো পাজের কাছে বল দিয়ে, অ্যাসিস্ট করেন মেসি। আর ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে নিজেই করেন একটি গোল। এক গোল, দুই অ্যাসিস্ট—আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচেও নিজের স্বাক্ষরটা রেখেই গেলেন ৩৯ বছরের কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসি।

একই সঙ্গে তাঁর এই শেষ যাত্রায়, গ্যালারিভর্তি ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে মাইক হাতে তুলে ধরেন নিজের মনের কথা। ফুটবল জগতের এই মহাতারকা বলেন, আর্জেন্টিনার জার্সি ২০ বছরেরও বেশি সময় পরা তাঁর জন্য ছিল বিশাল গর্বের বিষয়। খারাপ সময়েও তিনি লড়াই থামাননি, সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন দলের জন্য। তবে জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে না নামার বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দেবে বলেও জানান লিওনেল মেসি। তাঁর ভাষায়, সুযোগ থাকলে সারাজীবন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতেন তিনি—কারণ জাতীয় দলের হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর আর কিছুই তাঁর কাছে নেই।

বিদায়ের আয়োজন

শুধু মাঠেই নয়, প্রিয় অধিনায়কের বিদায়কে স্মরণীয় করে তুলতে সাজানো হয়েছিল পুরো আর্জেন্টিনাকেই। বুয়েনস আইরেসের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় ফুটে উঠেছিল আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙের আবহ। আর মেসির জন্মশহর রোসারিওতে ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ মেমোরিয়ালের সামনে মেলে ধরা হয় প্রায় ৩০ মিটার দীর্ঘ বিশাল ১০ নম্বর জার্সি—যেখানে নামের জায়গায় লেখা ছিল ‘Gracias’, অর্থাৎ ধন্যবাদ। মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামেও বিদায়ের আয়োজন ছিল চোখধাঁধানো—আতশবাজি, আলো, সংগীত আর ড্রোন শোতে শেষবারের মতো উদযাপিত হয় আর্জেন্টিনার এই মহাতারকার জাতীয় দলের শেষ অধ্যায়।

এর মধ্য দিয়েই শেষ হলো আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বসেরা এই ফুটবল অধিনায়কের ২১ বছরের আন্তর্জাতিক যাত্রা। ২০০৫ সালে অভিষেকের পর জাতীয় দলের হয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল—আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবেই বিদায় নিলেন তিনি।

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

কিন্তু দিন শেষে প্রশ্ন একটাই—যে আর্জেন্টিনা একসময় বারবার ফাইনালে গিয়েও ফিরেছে শূন্য হাতে, সেই দলকে বিশ্বজয়ের মুকুট পরিয়ে দেয়া মানুষটিকে সংখ্যায় কি আর মাপা যায়? লিওনেল মেসিই কোপা আমেরিকার শিরোপা জয়ে ২০২১ ও ২০২৪ সালে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর ২০২২ সালে কাতারে, তাঁর হাতেই উঠেছে সেই বহু কাঙ্ক্ষিত ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফি। একইসঙ্গে ২০২২ সালের ফাইনালিসিমার ট্রফিও। এর আগে আর্জেন্টিনার যুব দলের হয়ে মেসি অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ও ২০০৮ অলিম্পিক স্বর্ণও জিতেছেন।

অপরদিকে, ক্লাব ফুটবলেও অর্জনের খাতা আরও দীর্ঘ। বার্সেলোনার জার্সিতে ১০টি লা লিগা, চার চ্যাম্পিয়নস লিগ, সাত কোপা দেল রে ও তিন ক্লাব বিশ্বকাপসহ অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন মেসি। সেই সঙ্গে পিএসজির হয়ে দুই লিগ ওয়ান এবং ইন্টার মায়ামির হয়ে ২০২৩ সালের লিগস কাপ, ২০২৪ সালের সাপোর্টার্স শিল্ড ও ২০২৫ সালের এমএলএস কাপ জিতে তাঁর ট্রফির তালিকায় যোগ হয়েছে নতুন অধ্যায়।

এদিকে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটেও রয়েছে মেসির খাতায় আটটি ব্যালন ডি'অর—ফুটবল ইতিহাসে যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। রেকর্ড, গোল, অ্যাসিস্ট আর ট্রফির হিসাব ছাড়িয়ে মেসি নিজেই একটি ফুটবল-যুগের নাম হয়ে উঠেছেন—এমনটাই মনে করে তাঁর অগণিত ভক্ত।

শুরু থেকে শেষ

কিন্তু এই মেসির গল্পের শুরুটা ছিল না কোনো ঝলমলে স্টেডিয়ামে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মেসির ফুটবলের শুরুটা ছিল আর্জেন্টিনার রোসারিওর ছোট্ট এক পাড়ার মাঠে। মাত্র চার বছর বয়সে গ্র্যান্ডোলি ক্লাবে বল পায়ে যাত্রা। আট বছর বয়সে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ। সেখানেই ধরা পড়ে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা।

স্বপ্নের পথটা অবশ্য সহজও ছিল না। শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যায় বারবার চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে তাঁর। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমান স্পেনে। গন্তব্য—বার্সেলোনার লা মাসিয়া। ছোট্ট শরীর, অজানা দেশ, পরিবার-পরিজন ছেড়ে নতুন জীবন। কিন্তু সেই ছোট্ট ছেলেটিই ধীরে ধীরে পেরিয়ে যান একের পর এক ধাপ। বার্সেলোনার যুব দল থেকে মূল দলে, আর সেখান থেকেই রচনা করেন ফুটবল ইতিহাসে নিজের কৃতিত্বগাথা উপাখ্যান।

রোসারিওর ছোট্ট মাঠ থেকে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তার শেষ আন্তর্জাতিক স্টপেজ হলো বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল। গ্যালারিজুড়ে ‘গ্রাসিয়াস মেসি’, সবার চোখে জল, কণ্ঠে আবেগ আর সীমাহীন ভালোবাসা। মেসির এই বিদায় যেন কাদিয়ে তোলে গ্যালারির প্রতিটি হৃদয়।