সোমবার

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩ আশ্বিন, ১৪৩৩

মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার সামনে বড় প্রশ্ন

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:০১

শেয়ার

মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার সামনে বড় প্রশ্ন
ছবি সংগৃহীত

লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার ফুটবলে এই নামটি এখন পরিচয়, আবেগ ও ভালোবাসার প্রতীক। তার ফুটবল প্রতিভা এতটাই বিস্ময়কর যে সরাসরি তার তুলনা করা হয় ভিনগ্রহের কোনো প্রাণীর সঙ্গে। গত ২১ বছর বাঁ পায়ের জাদুতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে আগলে রেখেছেন তিনি, জিতিয়েছেন একাধিক শিরোপা। তবে সব অধ্যায়েরই সমাপ্তি থাকে। আর্জেন্টিনায় মেসির রোমাঞ্চকর অধ্যায়েরও বিদায়ঘণ্টা বাজতে চলেছে। ১ অক্টোবর বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে শেষবারের মতো আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে জড়াবেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা। এরই মধ্যে সামনে এসেছে প্রশ্ন—মেসির পর আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেবেন কে?

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনা যখন শেষবারের মতো বুটজোড়া তুলে রেখেছিলেন, তখনও একই প্রশ্ন উঠেছিল—ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া শূন্যতা কে পূরণ করবেন? গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, আরিয়েল ওর্তেগা, হুয়ান রোমান রিকেলমে ও পাবলো আইমারদের মতো তারকারা নিজেদের প্রতিভার জানান দিলেও ম্যারাডোনার মতো দীর্ঘমেয়াদি কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া রাজ্যের যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে ওঠেন মেসি।

দীর্ঘ কয়েক দশক পর আবারও একই চ্যালেঞ্জের মুখে আর্জেন্টিনা। তাদের ফুটবল ইতিহাসের সফলতম কাণ্ডারি বিদায়ের পথে। সামনে তাই একই প্রশ্ন ও উদ্বেগ। কোচ লিওনেল স্কালোনি কি মেসির রেখে যাওয়া রাজ্যের যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজে পেয়েছেন? নাকি ম্যারাডোনা-পরবর্তী সময়ের মতো দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের?

মেসির জায়গায় কারা

মেসির জায়গা কে নেবেন, আদৌ কেউ নিতে পারবেন কি না—সেই উত্তর সময়ই দেবে। তবে স্কালোনির হাতে এমন কিছু খেলোয়াড় আছেন, যারা মেসির অভাব পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা রাখেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন লাউতারো মার্তিনেস, হুলিয়ান আলভারেস, এনসো ফের্নান্দেস ও নিকো পাজ। ক্লাব ও জাতীয় দলে নিজেদের প্রমাণ করেছেন তারা। তবে মেসির পরম্পরা ঠিকভাবে বয়ে নিতে পারবেন কি না, তা এখনই বলা কঠিন।

বাস্তবতা হলো, মেসির জায়গা পূরণ করা যে কারও জন্যই অসাধ্য সাধনের মতো। গোল করা, গোল করানো, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া—এতদিন সবই করেছেন এই জাদুকর। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের কেউ গোল করায় পারদর্শী, কেউ গোল করানোয়। অনেকে আবার ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন কিংবা খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন। কিন্তু মেসির মতো একাই সব দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা এককভাবে কারও নেই।

মেসির এই বহুমুখী কার্যকারিতা নিয়ে কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছিলেন, ‘মেসিই সেরা ৯, সেরা ১০, সেরা ১১, সেরা ৭, সেরা ৬, সেরা ৫, সেরা ৪—সব পজিশনেই মেসিই সেরা।’

ডান প্রান্তে আলোচনায় নিকো পাজ

মেসি যে পজিশনে খেলেন, সেই ডান প্রান্ত নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। এই পজিশনে উঠে আসছে কোমোর তরুণ তারকা নিকো পাজের নাম। লাউতারো ও আলভারেস মূলত সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলেন। এনসো মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে পারদর্শী। পাজ মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে এসে খেলার সক্ষমতা রয়েছে।

বাঁ পায়ের এই তরুণ মেসির মতোই ডান দিক থেকে আক্রমণ তৈরি করতে পারেন। সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরির পাশাপাশি নিজেও গোল করে প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। ড্রিবলিং, পাসিং, ভিশন ও আক্রমণ তৈরির দক্ষতার কারণে মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার আক্রমণে তাকে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পাজের মানসিকতাও দৃঢ়। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর তিনি সরাসরি ঘোষণা দেন, ‘আমি কথা দিচ্ছি আর্জেন্টিনায় এই কাপ ফিরিয়ে আনতে আমি আমার সবটুকু দেব।’ ক্লাব পর্যায়েও নিয়মিত নিজের প্রতিভার জানান দিচ্ছেন ২২ বছর বয়সী এই ফুটবলার।

মেসির পর অধিনায়ক রোমেরো

দলের নেতৃত্বের জায়গাতেও বড় শূন্যতা তৈরি হবে। তবে এরই মধ্যে স্কালোনি জানিয়েছেন, মেসির পর অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরবেন ক্রিস্তিয়ান রোমেরো। দলে আরও যোগ্য নেতৃত্ব থাকার পরও রোমেরোর ওপর আস্থা রাখছেন কোচ। রক্ষণভাগ থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মাঠে তার আগ্রাসী মানসিকতা ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছেন স্কালোনি।

এরই মধ্যে মেসি ও নিকোলাস ওতামেন্দির পর তৃতীয় অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রোমেরো। ২০২৫ সালে চিলি, ভেনেজুয়েলা ও বিশ্বকাপের আগে মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে তিন ম্যাচে আর্মব্যান্ডও পরেছেন তিনি। ক্লাব পর্যায়েও অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

স্কালোনির সামনে বড় দায়িত্ব

মেসি-পরবর্তী যুগে আর্জেন্টিনাকে প্রস্তুত করার জন্য স্কালোনির ওপরই ভরসা রাখছে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন। ২০১৮ সালে দায়িত্ব নিয়ে তিনি যেভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করেছিলেন, এবারও তার ওপর একই প্রত্যাশা থাকবে সমর্থকদের। তবে কাজটি এবার আগের তুলনায় কঠিন হবে। আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে তিনি কতদিন দায়িত্ব পালন করবেন, সেটিও নিশ্চিত নয়।

‘এ দুনিয়া একবার পায়, তারে পায় নাকো আর’—পঙক্তিটি মেসির ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য। আর্জেন্টিনা তো বটেই, পুরো বিশ্বেই তার মতো আরেকজন খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই আর্জেন্টিনা ও স্কালোনির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় পারফরম্যান্সের মাধ্যমে মেসির অভাব পূরণের পরিকল্পনা করা। হুবহু মেসির উত্তরসূরি খোঁজার বিষয়টি আপাতত অনেকটা স্বপ্নের মতোই।