ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ মুকুট নিয়ে দেশে ফিরেছে বিশ্বমঞ্চের ‘নতুন’ রাজা স্পেন। নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের পরদিন স্থানীয় সময় সোমবার রাজধানী মাদ্রিদে পা রাখে লা রোজারা। রাজকীয় অভ্যর্থনা, বর্ণাঢ্য রোডশো আর লাখ লাখ ভক্তের মাতামাতিতে পুরো মাদ্রিদ যেন রূপ নিয়েছিল লোহিত সাগরে।
অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের মহাকাব্যিক জয়সূচক গোলে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরার ট্রফি উঁচিয়ে ধরে স্পেন। শিরোপা নিয়ে খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের বহনকারী বিমানটি মাদ্রিদে অবতরণ করার পর থেকেই শুরু হয় উৎসবের আমেজ।
বিশ্বজয়ী বীরদের শুরুতেই বরণ করে নেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ ও প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘মোনক্লোয়া প্যালেস’-এ আয়োজিত বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ফুটবলারদের শুভেচ্ছা জানিয়ে সানচেজ বলেন, ‘আমাদের উপহার দেয়া অসাধারণ ফুটবল শৈলী, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং এ গৌরবময় বিজয়ের জন্য কোচ ও খেলোয়াড়দের অশেষ ধন্যবাদ। আপনাদের খেলা দেখতে পেরে আমরা সত্যিই গর্বিত ও আনন্দিত।’
রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় লাল রঙের এক বিশেষ ছাদখোলা বাসে বহুল প্রতীক্ষিত ট্রফি প্যারেড। ‘স্টারস শাইন টুগেদার’ (নক্ষত্ররা একসঙ্গে জ্বলে) স্লোগান ও ফুটবলারদের ছবিসংবলিত ছাদখোলা বাসে চেপে ট্রফি হাতে রাস্তায় নামেন অধিনায়ক রদ্রি, উদীয়মান তারকা লামিন ইয়ামালসহ দলের ২৬ ফুটবলার। ট্রফি জয়ের শোভাযাত্রায় পরনে ছিল বিশেষ সংবর্ধনা টিশার্ট, যাতে লেখা ‘সোমোস ক্যাম্পিওনেস’ (আমরাই চ্যাম্পিয়ন)।
সানচেজের বাসভবন থেকে শুরু হয়ে প্যারেডটি ঐতিহাসিক সেন্ট্রাল মাদ্রিদ হয়ে পৌঁছায় ঐতিহ্যবাহী ‘সিবেলেস স্কয়ার’-এ। কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্যমতে, গোটা রাস্তায় বিশ্বজয়ীদের একনজর দেখতে এবং উল্লাসে শামিল হতে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে কেবল সিবেলেস স্কয়ারেই জমায়েত হয়েছিলেন অন্তত এক লাখ ২০ হাজার ফুটবলপ্রেমী। তীব্র গরম আর ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে ট্রফি প্যারেডের বহু আগেই ভক্তরা ছাতা মাথায় দিয়ে প্রিয় তারকাদের স্বাগত জানাতে অবস্থান নেন। বর্ণিল এ উৎসবে সুরের দোলা দিতে মঞ্চে হাজির ছিলেন আইতানা, আনা মেনা এবং লোলা ইন্দিগোর মতো জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীরা।
প্যারেড শুরুর আগে উচ্ছ্বসিত কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘এমন এক অনুগত ও অনুরাগী ভক্তদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ও আবেগের বিষয়। আমরা আনন্দে আত্মহারা।’
এবারের বিশ্বকাপ জয় স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে যুক্ত করেছে নতুন এক স্বর্ণালি অধ্যায়। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথমবার বিশ্বজয়ের ১৬ বছর পর আবার পুরুষ ফুটবলে সেরা হলো দেশটি। তবে এবারের জয়টির গুরুত্ব আরেক ধাপ বেশি। ২০২৩ সালে স্পেনের নারী ফুটবল দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০২৬ সালে পুরুষ দলের এ জয়ের মাধ্যমে ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে একই সঙ্গে নারী ও পুরুষ দুই ক্যাটাগরিতেই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল ও অভূতপূর্ব রেকর্ড গড়েছে স্পেন।
পুরো দেশ যখন জয়ের মহানন্দে ভাসছিল, তখন সালামানকা শহর থেকে আসে একটি হৃদয়বিদারক খবর। উল্লাসের একপর্যায়ে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ঝরনার স্তম্ভে উঠতে গিয়ে স্তম্ভ ভেঙে পড়ে ১৩ বছর বয়সি এক কিশোরের করুণ মৃত্যু হয়। এই ট্র্যাজেডি বাদে দেশটিতে চলছে খুশির জোয়ার। স্পেনজুড়ে রাতভর চলে বাঁধভাঙা আনন্দ-উৎসব।
২০১০ সালের সেই সোনালি অধ্যায়ের পর যারা বড় হয়েছে, সেই তরুণ প্রজন্মের জন্য এ জয় বিশেষ এক আবেগ নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে আবার ট্রফি ফেরায় সিবেলেস স্কয়ারের ঐতিহাসিক ফোয়ারা থেকে শুরু করে পুয়ের্তা দেল সোলে সবখানেই ফুটবলপ্রেমীরা লাল-হলুদ পতাকা উড়িয়ে নাচ-গান আর স্লোগানে মুখরিত করে রাখেন স্পেনের আকাশ-বাতাস।
আরও পড়ুন:








