সময়ের আবর্তে শেষ হয়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। তবে, বিশ্বকাপ শেষ হলেও বিতর্ক যেন শেষ হয়নি, বরং ফাইনালকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন, সমালোচনা আর ক্ষোভের এক দীর্ঘ তালিকা। সমালোচকরা বলছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রেফারিং ও সিদ্ধান্ত নিয়ে যে বিতর্ক চলছিল, তার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার ম্যাচে উত্তেজনার পাশাপাশি ফাউল, ধাক্কাধাক্কি, লাল কার্ড, গোল বাতিল এবং টুর্নামেন্টসেরা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা বিতর্ক।
মেসিকে ঘিরে টুর্নামেন্টসেরার বিতর্ক
ফাইনালের পর সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসির টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার না জেতা। পুরো টুর্নামেন্টে তার পারফরম্যান্স ছিল চোখ ধাঁধানো, আট গোল, চার অ্যাসিস্ট এবং আট ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতে ম্যাচসেরা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, পারফরম্যান্সের বিচারে মেসির রেটিং ছিল প্রায় ‘১০০’, যেখানে স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির রেটিং ধরা হচ্ছিল ‘১০’। সেই বিবেচনায় রানার্সআপ দল থেকে মেসিই সোনার বল পাবেন, এমন প্রত্যাশা ছিল ফুটবল সংশ্লিষ্টদের বড় একটি অংশের।
কিন্তু, সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে ফিফা সেরা ফুটবলারের পুরস্কার গোল্ডেন বল তুলে দেয় রদ্রির হাতে। এই ঘোষণার পরপরই গ্যালারিজুড়ে মেসির নামে জয়ধ্বনি ওঠে। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মেসি নিজেও। অনেকের চোখে এই প্রতিক্রিয়া ছিল ফিফার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। প্রশ্ন উঠেছে, এমন পারফরম্যান্সের পরও কেন বঞ্চিত হলেন মেসি?
লাল কার্ড নিয়ে তর্ক-বিতর্ক
অন্যদিকে, লাল কার্ড বিতর্ক ম্যাচের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয় বলেও বিতর্ক রয়েছে। আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ ৯৩তম মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এর আগে রেফারির সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন তিনি। পরে স্পেনের ডিফেন্ডার পাও কুবার্সির ওপর দেরিতে করা একটি ট্যাকলের কারণে দ্বিতীয়বার সতর্ক হয়ে লাল কার্ড পান এনজো।
সমর্থকদের একাংশের দাবি, ট্যাকলটি এতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না যে লাল কার্ড দিতে হবে। তাদের মতে, এনজো ফার্নান্দেজ বল দখলের উদ্দেশ্যেই ট্যাকল করতে গিয়েছিলেন, প্রতিপক্ষকে আঘাত করার জন্য নয়। ট্যাকলটি দেরিতে হলেও সেটি অতটা হিংস্র বা বিপজ্জনক ছিল না, তার পা খুব বেশি উঁচুতে ওঠেনি এবং স্টাডসও সরাসরি বিপজ্জনকভাবে প্রতিপক্ষের শরীরে লাগেনি। ফলে পাও কুবার্সি গুরুতর আঘাত পাওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।
তবে, বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বল স্পর্শে ব্যর্থ হয়ে প্রতিপক্ষকে বিপদের মুখে ফেলার মতো বেপরোয়া ট্যাকল করায় রেফারির সিদ্ধান্ত যৌক্তিক ছিল। এ কারণেই ভিএআর পর্যালোচনাতেও সেই সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
গোল বাতিলের সিদ্ধান্তেও প্রশ্ন
ফাইনালের আরেকটি বড় বিতর্ক ছিল স্পেনের গোল বাতিল হওয়া। স্প্যানিশদের হয়ে করা নিকো উইলিয়ামসের একটি গোল বাতিল করে দেন রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। আক্রমণের সময় মিকেল মেরিনোর সঙ্গে আর্জেন্টিনার নিকোলাস ওতামেন্দির সামান্য সংস্পর্শকে ফাউল হিসেবে ধরা হয়।
তবে রিপ্লেতে দেখা যায়, সংস্পর্শটি খুবই হালকা ছিল। স্পেনের খেলোয়াড়দের মতে, এটি গোল বাতিল করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তাদের মতে, ওই গোলটি বহাল থাকলে ম্যাচের ভাগ্য আরও আগেই নির্ধারিত হয়ে যেতে পারত।
ম্যাচ শেষে ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনা
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের তরুণ মিডফিল্ডার গাভিকে নিয়ে ম্যাচ শেষে শুরু হয় তুমুল উত্তেজনা। জানা যায়, শেষ বাঁশি বাজার পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা দ্রুতই সংঘর্ষে রূপ নেয়। আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের তরুণ মিডফিল্ডার গাভির একটি মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ধাক্কা দেন।
এর পরপরই দুই দলের খেলোয়াড়রা জড়ো হয়ে যায় এবং পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার-চেঁচামেচি, সব মিলিয়ে মাঠের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। শেষ পর্যন্ত সতীর্থ খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে।
এই ঘটনাটি শুধু ম্যাচের উত্তেজনাকেই নয়, বরং পুরো ফাইনালের চিত্রকেই আরও বিতর্কিত করে তোলে। কারণ, একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল সাধারণত যেখানে ফুটবলের সৌন্দর্য ও কৌশলের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে, সেখানে এই ম্যাচটি রুক্ষতা, উত্তেজনা এবং নিয়ন্ত্রণ হারানো মুহূর্তগুলোর জন্য দুর্বিষহ স্মৃতিতেই বেশি মনে রাখবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
বিতর্কে ঢাকা পড়ল বিশ্বকাপ
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন হয়ে উঠেছে এক বিতর্কময় আসর, যেখানে উপভোগ্য ফুটবলীয় মুহূর্তগুলো বারবার আড়াল হয়ে গেছে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন, রেফারিং বিতর্ক আর খেলোয়াড়দের উত্তেজনায়। তাদের মতে, এই আসরটিই হতে পারত ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর ও উপভোগ্য একটি বিশ্বকাপ, যেখানে স্মরণীয় হয়ে থাকত শুধুই অসাধারণ গোল, নিখুঁত কৌশল আর খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য। কিন্তু, হয়েছে ঠিক যেন তার উল্টো।
আরও পড়ুন:








