শুক্রবার

১০ জুলাই, ২০২৬ ২৬ আষাঢ়, ১৪৩৩

হাজার কোটি টাকা ইনভেস্ট ক্রিকেটে, ফুটবলে কেনো নেই?

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ জুলাই, ২০২৬ ২২:৪২

শেয়ার

হাজার কোটি টাকা ইনভেস্ট ক্রিকেটে, ফুটবলে কেনো নেই?
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

প্রায় তিন দশকের পথচলা, আর হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। অথচ প্রাপ্তির খাতা যেন শূন্য! সদ্যই জিম্বাবুয়ের মতো দুর্বল দলের কাছেও টেস্ট এবং ওয়ানডে সিরিজে পর্যুদস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। একদিকে ক্রিকেট বোর্ডে হরিলুট আর দুর্নীতির অভিযোগ, অন্যদিকে দেশের মানুষের আসল আবেগ ‘ফুটবল’ পড়ে আছে চরম অবহেলায়।

সম্প্রতি, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট এবং ওয়ানডে- দুই ফরম্যাটেই বাংলাদেশের শোচনীয় হার যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল দেশের ক্রিকেটের বর্তমান দৈন্যদশা। হারারেতে একমাত্র টেস্টে ইনিংস ও ৮৫ রানে হারের পর, ওয়ানডেতেও ইতোমধ্যে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ খুইয়েছে দল। বোর্ড সভাপতি ও সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের বহুল আলোচিত 'ক্যারিশমা'ও আজ যেন বড্ড ম্লান। ১৯৯৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ক্রিকেট যাত্রায় তিন দশক পেরিয়ে গেলেও, বিশ্বমঞ্চে বড় কোনো সাফল্য আজও অধরা। প্রশ্ন উঠেছে, বছরের পর বছর এই বিপুল বিনিয়োগের ফলাফল আসলে কী?

ব্যর্থতার পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে, বেরিয়ে আসে অর্থ নয়ছয় আর দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৫ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে রূপান্তর করতেই মিরপুরে খরচ হয়েছিল প্রায় ১১২ কোটি টাকা। এরপর রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রতি বছর কত টাকা উড়ে যায়, তার কোনো স্পষ্ট হিসাব নেই।

১১২ কোটি টাকা

সম্প্রতি, ২০২৬ সালের পরিকল্পনায় ৫টি স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট আপগ্রেড করতে ১৫০ কোটি টাকা, ডিজিটাল জায়ান্ট স্ক্রিন বসাতে কয়েক কোটি এবং নারী বিশ্বকাপ সামনে রেখে মিরপুরে সাড়ে ৭ হাজার চেয়ার বসাতেই খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। অথচ, জুন মাসে পরিচ্ছন্নকর্মীদের বেতন মাত্র সাড়ে ৪ হাজার টাকা বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করেছে বোর্ড।

১৫০ কোটি টাকা

তুলনামূলক চিত্রটা আরও বিস্ময়কর। ২০১১ বিশ্বকাপে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্স আধুনিকীকরণ করতে খরচ হয়েছিল ৭৮ কোটি টাকা। আর সুনামিতে ধ্বংস হওয়া শ্রীলঙ্কার গল স্টেডিয়াম আন্তর্জাতিক মানে ফেরাতে লেগেছিল মাত্র ১৮ কোটি টাকা। অথচ, এই টাকার চেয়েও বহুগুণ বেশি খরচ করে ফতুল্লা স্টেডিয়ামের দিকে তাকালে মনে হবে, এটি কোনো গোচারণ ভূমি বা মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা! আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পরিত্যক্ত স্টেডিয়ামটিকে সংস্কার করতেই ২৫০ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছে।

ইডেন গার্ডেন্স আধুনিকীকরণ ব্যয়: ৭৮ কোটি টাকা। শ্রীলঙ্কার গল স্টেডিয়াম: ১৮ কোটি টাকা

এছাড়াও, চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়াম, খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম, বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এইসব স্টেডিয়াম থাকলেও, সেখানে সেভাবে খেলা হয় না। ক্রিকেটটা শুধু মিরপুর স্টেডিয়াম কেন্দ্রিক কেন? এ নিয়ে রয়েছে নানা সমালোচনা। মাঝেমধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হলেও, সার্বজনীনভাবে প্রশ্ন রয়েছে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম এবং সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম নিয়েও।

এইসব স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে ক্রিকেটের সব জায়গাতে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হলেও, বারবার এখানেই অর্থ অপচয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্রিকেট নিয়ে বিগত ১৭ বছরের অসংখ্য অনিয়ম ও দুর্নীতির কোনো হিসাব নেই সে অর্থে। এই পরিস্থিতিতে, সাফল্যের কথা আসলেই শুধু হতাশার ছাপ।

ক্রিকেট পাড়ার দুর্নীতির শেকড় কতটা গভীরে, তা মাঝেমধ্যেই এসেছে আলোচনায়। পূর্বাচল স্টেডিয়ামের মাটি ভরাট থেকে শুরু করে, ডাব কেনার টেন্ডার নিয়েও চলেছে হরিলুট!

এদিকে, বাংলা এডিশনের টকশো অনুষ্ঠান ‘কারেন্ট এডিশন’-এ সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের মুখোমুখি হয়ে বিসিবির ভেতরের নানামুখী দুর্নীতি নিয়ে আরও খোলামেলা কথা বলেন সাবেক পরিচালক আসিফ আকবর।

ক্রিকেট নিয়ে যখন এই সীমাহীন হতাশা, তখন দেশের মানুষের আসল আবেগের জায়গা ফুটবল নিয়েও উঠেছে আলোচনা। বিশ্বকাপ এলেই পুরো দেশ ভাগ হয়ে যায় ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনায়। ক্রিকেটে এত বিনিয়োগের পরও যখন প্রাপ্তি শূন্য, তখন ফুটবলে দেশের আছে সাফ চ্যাম্পিয়ন বা এসএ গেমসে সোনা জয়ের মতো সোনালী অতীত।

এছাড়া, ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারে ৪-জাতির টাইগার ট্রফি জয়, ১৯৯৯ সালে এসএ গেমসে স্বর্ণপদক কিংবা সাফ গোল্ড কাপের রানার্স-আপ হওয়ার সেই গৌরবময় ইতিহাস, আজ ঢাকা পড়েছে ক্রিকেটের আড়ালে। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, নব্বইয়ের দশক থেকে ক্রিকেটের পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ও সময় ব্যয় করা হয়েছে, তার অর্ধেকও যদি ফুটবলে বিনিয়োগ হতো, বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে অন্য উচ্চতায় থাকতো।

১৯৯৫ সালে টাইগার ট্রফি। ১৯৯৯ সালে এসএ গেমস স্বর্ণপদক

ক্রিকেটের এই ব্যর্থতার আলোচনা উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। জনপ্রিয় অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ইলিয়াস হোসাইন তার এক পোস্টে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ফুটবলের উন্মাদনায় তামিম ইকবালের ক্যারিশমা ভুলে যাবেন না, শক্তিশালী জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ হার। তিন দশকেও কোনো অর্জন নেই ক্রিকেটে। ফুটবল নিয়ে ভাবা দরকার।

একইভাবে আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, বিগত তিন দশকে ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এই অর্থ ফুটবলের জন্য খরচ করলে বিশ্বকাপে অন্য দেশের সমর্থন করতে হতো না।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পেছনে প্রতি বছর গড়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে, দেশের ফুটবলের পেছনে প্রতি বছর গড়ে ৬০ থেকে ৬২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। হিসাব কষলে দেখা যায়, ক্রিকেটের তুলনায় দেশের ফুটবলের পেছনে প্রায় ৬ গুণ কম অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। অবহেলার এই চাদরে ঢাকা পড়ে ফুটবল যেন আজ এক কোণঠাসা খেলা।

তবে, বারবার ব্যর্থতার পরও ক্রিকেটের অর্থের জোয়ার যেখানে বিসিবিকে করেছে স্বাবলম্বী, সেখানে হাঁপাতে থাকা দেশের ফুটবল কেবলই অর্থের অভাবে ধুঁকছে। তাই আলোচনা উঠেছে, নতুন করে ভাবার। দুর্নীতি আর ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে, কোটি ভক্তের প্রিয় এই খেলাটিকে মাঠ থেকে তুলে আনতে, ক্রিকেটের মতো সমপর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা আর সঠিক ব্যবস্থাপনার দাবি এখন সবার।

৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা। ৬০ থেকে ৬২ কোটি টাকা

ক্রিকেটের এই খরা আর হরিলুটের মাঝে ফুটবলই হতে পারে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের নতুন দিশা। প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা আর দুর্নীতিমুক্ত বিনিয়োগের। বাংলাদেশের সাবেক ফুটবলার কায়সার হামিদ মনে করেন, সরকার চাইলেই দেশ একদিন বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করবে। দরকার সুন্দর পরিকল্পনা আর বিনিয়োগ।

ক্রিকেটের কোটি টাকার ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে, গণমানুষের আসল আবেগ ফুটবলকে জাগিয়ে তোলার সিদ্ধান্ত এখন সময়ের দাবি।



banner close
banner close