নেইমারের ব্রাজিলের পর এবার বিশ্বমঞ্চ থেকে ছিটকে গেল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। ডালাসের মাঠে রেফরির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই স্তব্ধ হয়ে গেল ফুটবল ইতিহাসের এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে স্পেনের কাছে ১-০ গোলের এই হার যেন শুধু একটি ম্যাচের পরাজয় নয় একটি যুগের অবসান।
নির্ধারিত ৯০ মিনিট মাঠের লড়াইয়ে কোনো পক্ষই জালের দেখা পায়নি। তবে যোগ করা সময়ে পাশার দান উল্টে দেন বদলি নামা স্প্যানিশ তারকা মিকেল মেরিনো। তার করা সেই একমাত্র গোলই চূর্ণ করে দেয় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটার স্বপ্ন।
অথচ এই ম্যাচটিকে ঘিরে ছিল অন্যরকম এক আবেগ। কেননা ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা ম্যাচের আগের দিন নিশ্চিত করেছিলেন এটাই তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। ২৩৩তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে নামার আগে স্পেনের বিপক্ষে নিজের পুরোনো ফর্ম ও দলের শক্তির ওপর অগাধ বিশ্বাস ছিল সিআর সেভেনের। কিন্তু মাঠের নির্মম বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত ভিন্ন এক গল্প লিখল।
এই ট্র্যাজিক বিদায়ের নেপথ্যে রয়েছে এক রূপকথার মতো ক্যারিয়ার। পর্তুগালের মাদেইরা দ্বীপে চরম দারিদ্র্যের মাঝে জন্ম নেওয়া রোনালদোর পথচলা থমকে যেতে পারত মাত্র ১৫ বছর বয়সেই হার্টের এক জটিল অপারেশনে। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে যিনি মাঠে ফিরেছিলেন তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
বাতাসে লাফিয়ে হেড করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা দুই পায়ে নিখুঁত শট আর চমৎকার পজিশনিং সেন্স সবখানেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পেনাল্টি কিংবা ফ্রি-কিকেও তার দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। গতি শক্তি ও অতিমানবীয় ড্রিবলিং দক্ষতার এক অবিশ্বাস্য সংমিশ্রণে নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আধুনিক নাম্বার সেভেন বা স্ট্রাইকার পজিশনের সত্যিকারের পথপ্রদর্শক হিসেবে।
অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে প্রথম ব্যালন ডি’অর জয় আর রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫১ গোলের অতিমানবীয় রেকর্ড তাঁকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। জুভেন্টাস ঘুরে ২০২৬ সালে আল-নাসরকে সৌদি প্রো লিগ জেতানো এই রাজপুত্রের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও রেকর্ডে মোড়ানো।
২০১৬ সালের ইউরো কিংবা ২০১৯ সালের নেশনস লিগ জয়ী এই তারকা চলতি বিশ্বকাপেও ইতিহাস গড়েছেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোল করে বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৬টি ভিন্ন বিশ্বকাপে স্কোর করার অনন্য কীর্তি গড়েন ছেলেদের আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই সর্বোচ্চ গোলদাতা।
এতসব অর্জনের পেছনে লুকিয়ে ছিল কিছু গভীর ব্যক্তিগত কষ্টও। ২০০৫ সালে ক্যারিয়ারের শুরুতে বাবাকে হারানো কিংবা ২০২২ সালে নবজাতক সন্তানের মৃত্যুর মতো ট্র্যাজেডি বুকে চেপেই লড়ে গেছেন এই লড়াকু সৈনিক। পাঁচটি ব্যালন ডি’অর আর ক্লাবের সব ট্রফি জিতলেও ফুটবল বিধাতা তাঁর শোকেসে একটি সোনালি বিশ্বকাপ ট্রফি কখনোই যোগ করেননি। ৭ জুলাই ২০২৬ এর রাত তাই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়কের এক অপূর্ণ মহাকাব্যের শেষ পাতা হয়েই ইতিহাসে জমা রইল।
আরও পড়ুন:








