বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে জার্মানিকে যে ছকে বিদায় করেছিল, ফ্রান্সের বিপক্ষেও সেই একই ছকে মাঠে নামে প্যারাগুয়ে। এক ঘণ্টারও বেশি সময় তারা আটকে রাখে ফরাসিদের। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের ভুলেই গোল হজম করে লাতিন আমেরিকার দলটি। প্যারাগুয়ের ‘দেওয়াল’ টপকে পাওয়া জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে দিদিয়ের দেশমের দল।
শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর ম্যাচে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়েছে ফ্রান্স। প্রথমার্ধ ছিল গোলশূন্য। ৭০তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে দলকে এগিয়ে দেন কিলিয়ান এমবাপে।
কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ মরক্কো। আগামী বৃহস্পতিবার রাতে বোস্টন স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুই দল। শনিবার রাতে সহ-আয়োজক কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার দেশটি।
এদিন শুরু থেকেই বলের দখল ধরে রাখলেও প্যারাগুয়ের ৫-৪-১ ফর্মেশনের সামনে তেমন কিছুই করতে পারছিল না ফ্রান্স। প্রথমার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের আগ পর্যন্ত কার্যকর কোনো আক্রমণও গড়তে পারেনি এমবাপে ব্রিগেড। প্রতিপক্ষের বক্সে এ সময় তারা ঢুকতে পেরেছে মাত্র চারবার। এমনকি প্রথম ২০ মিনিটের মধ্যে প্যারাগুয়ের গোলে একটি শটও নিতে পারেনি ফরাসিরা।
১৯৬৬ সালের পর এ নিয়ে মাত্র তৃতীয়বার বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিটে কোনো শট নিতে পারেনি ফ্রান্স। এর আগে ২০২২ সালে এমনটা দুবার ঘটেছিল। একবার তিউনিসিয়ার বিপক্ষে, যেখানে তাদের প্রথম শট আসে ২৫তম মিনিটে এবং আরেকবার আর্জেন্টিনার বিপক্ষে, যেখানে প্রথম শট আসে ৬৮তম মিনিটে।
৩১তম মিনিটে প্রতিপক্ষের গোলমুখের সামনে থাকা এমবাপে দারুণ একটি ক্রস পেলেও লাফিয়ে উঠে বলে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি। পরের মিনিটে আদ্রিয়েন রাবিওর সোজা শট পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়।
এর কিছুক্ষণ পর দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বাম প্রান্ত ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এমবাপে। তাঁকে পেছন থেকে টেনে ধরেন প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার আন্দ্রেস কুবাস। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ফরাসি ফরোয়ার্ড। পরে অন্য খেলোয়াড়েরাও এতে জড়িয়ে পড়লেও রেফারি পরিস্থিতি শান্ত করেন।
শেষ পর্যন্ত প্রথমার্ধে উল্লেখযোগ্য কিছুই ঘটেনি। এদিন প্রথমার্ধে ফ্রান্স ২০টি ক্রস করে, যা বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের প্রথমার্ধে তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে ২০০৬ বিশ্বকাপে টোগোর বিপক্ষে ২৭টি ক্রস করেছিল ফরাসিরা। তবে এতগুলো ক্রসের পরও বক্সে প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারেননি এমবাপে, দেম্বেলেরা।
দ্বিতীয়ার্ধের ৫২তম মিনিটে পরপর দুটি সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করে ফ্রান্স। ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ীরা সহজেই এগিয়ে যেতে পারত। প্রথমে প্রতি আক্রমণ থেকে মাইনান লম্বা পাস বাড়ান এমবাপের দিকে। প্যারাগুয়ের রক্ষণভাগের কয়েকজন খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যান ফরাসি অধিনায়ক। কিন্তু গোলকিপারের সামনে ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে বল ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি। প্যারাগুয়ের ডিফেন্ডার কাসেরেস পেছন থেকে দুর্দান্ত ট্যাকলে বল কর্নারের বিনিময়ে বাইরে পাঠিয়ে দেন।
এরপর প্যারাগুয়ের খেলোয়াড়রা এমবাপের বিরুদ্ধে হ্যান্ডবলের আবেদন জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এদিকে কর্নার থেকে বল পেয়ে এগিয়ে যান দেম্বেলে। তবে বক্সের কোণা থেকে নেওয়া তাঁর শট পাশের জালে লাগে।
দুই মিনিট পর বক্সের বাইরে থেকে কোনের দূরপাল্লার শট লাফিয়ে জালের ওপর দিয়ে কর্নারের বিনিময়ে রুখে দেন প্যারাগুয়ের গোলকিপার অরল্যান্ডো গিল।
তবে ম্যাচের ৬৬তম মিনিটে পেনাল্টি বক্সে বড় ভুল করে বসে প্যারাগুয়ে। বদলি খেলোয়াড় দুয়েকে ফাউল করেন দিয়োগো গোমেজ। প্রথমে রেফারি খেলা চালিয়ে দিলেও পরে ভিএআর পর্যালোচনার পর পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন।
সফল স্পটকিকে ৭০তম মিনিটে ম্যাচের অচলাবস্থা ভাঙেন এমবাপে। গোলকিপারকে উল্টো দিকে পাঠিয়ে পোস্টের ডান দিকের নিচু কোনা দিয়ে বল জালে জড়ান এই ফরোয়ার্ড। এর মধ্য দিয়ে চলতি বিশ্বকাপে নিজের সপ্তম গোল করেন ২৭ বছর বয়সী রিয়াল মাদ্রিদ তারকা, যা লিওনেল মেসির গোলসংখ্যার সমান।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসির ২০ গোলের চেয়ে এখন মাত্র এক গোল পিছিয়ে এমবাপে। তাঁর বিশ্বকাপে মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯।
৮৯তম মিনিটে ফ্রান্সের লিড দ্বিগুণ হতে দেননি প্যারাগুয়ের গোলকিপার গিল। পরের মিনিটে প্যারাগুয়ের বদলি মিডফিল্ডার মাউরিসিওর নিচু শট ডান দিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন ফ্রান্সের গোলকিপার মাইক মাইনান। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে পরপর দুটি গতিময় শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন গিল। খেলার বাকি সময়ে চেষ্টা করেও আর গোলের দেখা পায়নি কোনো দল। ফলে ১-০ গোলের জয় নিয়েই কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে ফ্রান্স।
আরও পড়ুন:








