শুক্রবার

২৬ জুন, ২০২৬ ১২ আষাঢ়, ১৪৩৩

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় বাংলাদেশ, মাঠে তলানিতে র‍্যাংকিং

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬ ২১:৪৮

শেয়ার

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় বাংলাদেশ, মাঠে তলানিতে র‍্যাংকিং
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনায় দেশজুড়ে যখন লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে উৎসবে মেতে উঠেছে, ঠিক তখনই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে পুরনো প্রশ্নটি-বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নিজস্ব ফুটবল দল কবে খেলবে? ফিফার সর্বশেষ র‍্যাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের ২১০টি ফুটবল খেলুড়ে দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম, যা দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর আবেগের বিপরীতে এক কঠিন বাস্তবতা।

উন্মাদনার চিত্র

চলতি বিশ্বকাপ চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় বিশালাকার প্রজেক্টরে খেলা দেখতে হাজারো দর্শক জমায়েত হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও প্রিয় দলের গোলে উৎসবে মেতে উঠেছেন শিক্ষার্থীরা। ইতালিয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের এই ফুটবল জোয়ারের একটি ভিডিও প্রকাশ করে প্রশংসা জানিয়েছেন। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের দল না থেকেও একটি দেশ কীভাবে ফুটবল উৎসবে কাঁপতে পারে, তার অনন্য নজির হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

ক্ষুদ্র দেশের বিশ্বকাপ অর্জন

চলতি বিশ্বকাপে রেকর্ড ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে, যাদের মধ্যে আয়তন ও জনসংখ্যায় বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ছোট বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র রয়েছে। ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কিউরাসাও মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তন এবং দেড় লাখ জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। আটলান্টিক মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও কিউরাসাও ও কেপ ভার্দের সামগ্রিক জিডিপি বাংলাদেশের একটি খাতের বার্ষিক বাজেটের চেয়েও কম। একইভাবে নিউজিল্যান্ড, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, নরওয়ে, জর্ডান, হাইতি, উরুগুয়ে, কাতার ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলোর জনসংখ্যা বাংলাদেশের একটি বিভাগের সমতুল্য বা তার চেয়েও কম। ভৌগোলিক আয়তনে বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের চেয়ে ছোট হলেও আধুনিক ফুটবলে তারা বিশ্বমঞ্চে নিয়মিত প্রতিযোগিতা করছে।

বাংলাদেশের দুরবস্থার কারণ

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন বা বাফুফে প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হয়েছে। তথাপি দেশের ফুটবল অবকাঠামো এখনো পেশাদার মানে উন্নীত হয়নি। তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাইয়ের কোনো কার্যকর একাডেমি নেই, ঘরোয়া লিগগুলোর মান অত্যন্ত নিম্ন এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অনুপস্থিতি স্পষ্ট। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বাফুফের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার ঘাটতিই মূলত এই দুরবস্থার জন্য দায়ী।

অন্যদিকে ঘানা, হাইতি ও কঙ্গোর মতো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোও বিশ্বকাপে নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে। সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও তারা আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

উত্তরণের পথ

দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ অসম্ভব নয়। তাদের মতে, ফুটবলকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে দীর্ঘমেয়াদী ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দুর্নীতিমুক্ত লিগ পরিচালনা এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, দেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর আবেগ ও উৎসাহকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এবং বাফুফে প্রকৃত অর্থে সংস্কারমুখী পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তন ও ২০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে ফুটবলের প্রতি আগ্রহী মানুষের কোনো অভাব নেই। তবে সেই আগ্রহকে মাঠের পারফরম্যান্সে রূপান্তরিত করতে পারলেই কেবল লাল-সবুজ পতাকা একদিন বিশ্বকাপের মাঠে উড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।



banner close
banner close