শুক্রবার

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩ আশ্বিন, ১৪৩৩

এআই যেভাবে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে

সিএনএন

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:০৩

আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:০৬

শেয়ার

এআই যেভাবে মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে
প্রাণঘাতী জীবাণু, স্বয়ংক্রিয় রোবট ও নিয়ন্ত্রণহীন সক্ষমতা নিয়ে গবেষকদের আশঙ্কা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই একদিন পুরো মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের কিছু গবেষক। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, আগামী এক দশকের মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে।

সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের কর্মী জ্যাকব কক্সন এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্মী ইভান হুবিঙ্গার মনে করেন, ১০ বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি।

মেশিন ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সভাপতি নেট সোয়ারেসের আশঙ্কা আরও বড়। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে পৃথিবীর শেষ মানুষটিও মারা যাবে।

তবে এআই গবেষকদের সবাই এমন আশঙ্কার সঙ্গে একমত নন। সমালোচকদের প্রশ্ন, একটি কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থা কীভাবে মাত্র এক দশকের মধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৮৩০ কোটি মানুষকে হত্যা করতে পারে, সে বিষয়ে এসব পূর্বাভাসে বিস্তারিত ব্যাখ্যা খুবই কম।

এআই নাউ ইনস্টিটিউটের প্রধান এআই বিজ্ঞানী ও সাবেক ওপেনএআই নিরাপত্তা প্রকৌশলী হেইডি খলাফ বলেন, বৈজ্ঞানিক দাবির ক্ষেত্রে এমন প্রমাণ থাকা প্রয়োজন, যা দিয়ে সেই দাবি সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করা যায়।

প্রাণঘাতী ভাইরাস তৈরির আশঙ্কা

এআই থেকে মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাব্য একটি পথ হিসেবে কিছু গবেষক প্রাণঘাতী জীবাণু অস্ত্রের কথা বলছেন। তাঁদের ধারণা, অত্যন্ত শক্তিশালী কোনো এআই মানুষকে ব্যবহার করে ভয়ংকর ভাইরাস তৈরির কাজ করাতে পারে।

এআই ফিউচারস প্রজেক্টের গবেষক ও মেশিন ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক কর্মী থমাস লারসেন বলেন, কোনো অতিবুদ্ধিমান এআই মানুষকে প্রভাবিত করে প্রাণঘাতী ভাইরাস তৈরিতে সহায়তা করতে পারে, এমন পরিস্থিতি কল্পনা করা সম্ভব।

তবে ভাইরাস তৈরি ও তা ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জটিল। শুধু কোনো এআই ব্যবস্থাকে প্রাণঘাতী ভাইরাসের নকশা দিতে বললেই সেটি বাস্তবে তৈরি হয়ে যাবে না। ভাইরাস তৈরির পাশাপাশি তা উৎপাদন ও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যও জটিল বাস্তব অবকাঠামোর প্রয়োজন।

কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেশিন লার্নিংয়ের অধ্যাপক এবং জীববিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে পিএইচডিধারী এরিক শিং বলেন, এ ধরনের কাজ নির্দেশনা ছাড়া লেগো দিয়ে কোনো কাঠামো তৈরির মতো। একটি ধাপে ভুল হলেই পুরো প্রক্রিয়া ব্যর্থ হতে পারে।

স্বয়ংক্রিয় রোবট নিয়ে শঙ্কা

এআইয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় হত্যাকারী রোবটের বিশাল বাহিনী তৈরির আশঙ্কাও আলোচনায় রয়েছে।

নেট সোয়ারেসের মতে, এমন রোবট তৈরি হলে, যেগুলো নিজেরাই শক্তি অবকাঠামো ও কারখানা তৈরি করতে এবং সেখান থেকে আরও রোবট বানাতে পারে, তখন পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

তবে বাস্তবে এখনো এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। প্রযুক্তিবিদ ইলন মাস্কের বহুল আলোচিত অপটিমাস রোবটও ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী এখনো ব্যাপকভাবে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায়নি। একইভাবে লাখ লাখ রোবট স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে নিজেদের মতো করে আরও রোবট তৈরির ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি।

পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে এআই

আরেকটি প্রশ্ন হলো, এআই কি পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে?

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হার্বার্ট লিনের মতে, এআই পারমাণবিক যুদ্ধের মতো বড় ঝুঁকিগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে তাঁর মতে, পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকৃত ঝুঁকি এখনো অস্ত্রগুলোর মধ্যেই রয়েছে; ভবিষ্যতের কোনো কাল্পনিক এআই পরিস্থিতিতে নয়।

এআই নাউ ইনস্টিটিউটের হেইডি খলাফ জানান, পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সাধারণত উন্মুক্ত ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। ফলে এআই ব্যবস্থার পক্ষে সরাসরি এসব স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কঠিন। এসব স্থাপনা কঠোর নিরাপত্তা ও প্রকৌশল মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হয়।

এআইয়ের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোই বড় উদ্বেগ

নেট সোয়ারেস এবং এআইয়ের অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন অন্য গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এমন একটি এআই নিয়ে, যা নিজেই নিজের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। মানুষের সাহায্য ছাড়াই যদি কোনো এআই বারবার নিজের কর্মক্ষমতা বাড়াতে থাকে, তাহলে একপর্যায়ে সেটি মানুষের কল্পনার বাইরে গিয়ে নতুন কৌশল তৈরি করতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

সোয়ারেসের মতে, বিপদ শুধু এআই পারমাণবিক অস্ত্র দখল করবে কি না, তা নয়। বরং এমন এআই তৈরি হতে পারে, যা মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজস্ব অস্ত্র বা আরও উন্নত প্রযুক্তি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করবে।

তাঁর আরও আশঙ্কা, এআইকে মানুষবিরোধী হতে হবে এমন নয়। কোনো অত্যন্ত শক্তিশালী এআইয়ের এমন লক্ষ্য থাকতে পারে, যা পূরণ করতে আরও বেশি কম্পিউটার বা সম্পদ প্রয়োজন হয়। মানুষের নিরাপত্তাকে সে গুরুত্ব না দিলে তার কর্মকাণ্ডই মানব টিকে থাকার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে ওপেনএআই সম্প্রতি তাদের এআই মডেলগুলোতে মিসঅ্যালাইনমেন্টের নতুন কিছু ঘটনা শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় পরীক্ষাধীন একটি মডেলকে স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করার নির্দেশ দিতে দেখা যায়।

তবে কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এরিক শিং মনে করেন, শুধু অতিমানবীয় এআইয়ের সম্ভাব্য ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে এমন ভয়াবহ পূর্বাভাস দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, নীতি ও আইন তৈরির ক্ষেত্রে বাস্তব প্রমাণ, পরিমাপযোগ্য ফলাফল এবং শারীরিক জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রমাণ প্রয়োজন।

এআই ফিউচারস প্রজেক্টের গবেষক থমাস লারসেন অবশ্য মনে করেন, অতিমানবীয় এআই তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাস্তব এবং তা ঠেকাতে মানুষকে সচেতনভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।

এআইয়ের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও প্রযুক্তির সক্ষমতা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।