কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) শক্তিশালী মডেল তৈরির দৌড়ে শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং নির্বাহীদের মধ্যে বাড়তে থাকা অবিশ্বাস মানবতার জন্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর)। প্রকাশিত এক সংবাদ বিশ্লেষণে এমন সতর্কতার কথা জানিয়েছেন এআই খাতের বিশেষজ্ঞরা।
‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-কে দুই ডজনের বেশি এআই গবেষক, বিনিয়োগকারী, শিক্ষাবিদ ও নীতিবিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, একসময় যেসব এআই সক্ষমতাকে আরও কয়েক বছর দূরের বিষয় বলে মনে করা হতো, সেগুলো এখন দ্রুত বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। তবে প্রযুক্তি নির্মাতা কোম্পানিগুলোও ক্রমেই তীব্র বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির এআই অধ্যাপক স্টুয়ার্ট রাসেল বলেন, কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শর্টকাট নিতে বাধ্য করে-এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।
এআই নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সনের পদত্যাগের পর। চলতি সপ্তাহের শুরুতে পদত্যাগ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করেন, চলতি দশকের শেষ নাগাদ এই প্রযুক্তি মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের প্রধান ইভান হুবিঙ্গার বলেন, আগামী এক দশকের মধ্যে ব্যাপক প্রাণহানি বা মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি। এআই নিরাপত্তা গবেষক ও সম্প্রতি ওপেনএআই ফাউন্ডেশনের বোর্ডে নিয়োগ পাওয়া পল ক্রিস্টিয়ানোও সতর্ক করে বলেছেন, শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে ‘বেশিরভাগ মানুষ মারা যাবে’।
শক্তিশালী এআইয়ের বেপরোয়া বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠান দুটি আগের কিছু নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি শিথিল করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এআই এজেন্ট নিয়ে নতুন শঙ্কা
এদিকে এআই উন্নয়নে বিপুল গতি এসেছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ক্রমেই শক্তিশালী মডেল তৈরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে এআই ‘এজেন্ট’-এর বাড়তে থাকা স্বায়ত্তশাসন। এসব সিস্টেম সীমিত মানব তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তি, পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু মডেলের মধ্যে প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, ব্ল্যাকমেইল এবং বন্ধ করে দেওয়া এড়ানোর চেষ্টা দেখা গেছে। গবেষকেরা ‘রিওয়ার্ড হ্যাকিং’-ও লক্ষ্য করেছেন। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সিস্টেমগুলো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পথ খুঁজে নেয়, যা নির্মাতারা চাননি।
একটি অপ্রকাশিত ওপেনএআই মডেলের পরীক্ষায় এক হাজারের বেশি এআই এজেন্ট হাগিং ফেস নামের সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মের সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষায় প্রতারণা করতে সমন্বিতভাবে কাজ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বার্তা বোর্ডের মাধ্যমে যোগাযোগ, কাজ ভাগ করে নেওয়া এবং নিজেদের কর্মকাণ্ড গোপন করতে তথ্য পরিবর্তন করেছে।
আধুনিক এআই গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ ইয়োশুয়া বেঙ্গিও বলেন, এতে বোঝা যাচ্ছে ঝুঁকিগুলো আর শুধু তাত্ত্বিক নয়। তার ভাষায়, এখানে শুধু এআইয়ের নিজস্ব লক্ষ্য থাকার বিষয় নয়; বরং সেটি যে লক্ষ্য বেছে নিয়েছে, তা ‘অপরাধমূলক’। বাস্তব জগতে এটি অন্য একটি কোম্পানিকে আক্রমণ করছে।
এদিকে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, গুগল ও মেটার ১ হাজার ২০০-এর বেশি কর্মী এআই উন্নয়ন ধীর করতে আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, বড় এআই কোম্পানিগুলোর অস্তিত্বের ঝুঁকি নিয়ে বেশি জোর দেওয়ার ব্যবসায়িক স্বার্থও থাকতে পারে। কারণ ব্যয়বহুল নিরাপত্তা বিধিমালা ছোট প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বড় কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিতে পারে।
উন্নত এআই কীভাবে মানবতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে, তার সুনির্দিষ্ট পথ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে গবেষকেরা সাইবার হামলা এবং জৈবিক অস্ত্র তৈরিতে এআইয়ের সম্ভাব্য ব্যবহারের মতো তাৎক্ষণিক ঝুঁকির কথা উল্লেখ করছেন।
সেন্টার ফর হিউম্যান টেকনোলজির সহপ্রতিষ্ঠাতা ট্রিস্টান হ্যারিস বলেন, মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত সমাজ এমন একটি প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে কি না, যা ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার মতে, মানুষ এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করা সবচেয়ে শক্তিশালী, অনিয়ন্ত্রিত ও দুর্বোধ্য প্রযুক্তি প্রকাশ করছে, যা শেষ পর্যন্ত ‘বিপর্যয়ের রেসিপি’ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
আরও পড়ুন:







