মঙ্গলবার

২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১০ ভাদ্র, ১৪৩৩

ঘুষের তথ্য জানাতে ‘ঘুষসাইট’ ৪৫৮ রিপোর্টে ২.৪৫ কোটি টাকার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১৩:৪৮

আপডেট: ২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১৩:৫০

শেয়ার

ঘুষের তথ্য জানাতে ‘ঘুষসাইট’ ৪৫৮ রিপোর্টে ২.৪৫ কোটি টাকার দাবি
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কত টাকা ঘুষ দাবি করা হচ্ছে, তা বেনামে জানাতে চালু হয়েছে ‘ঘুষসাইট’ (ghush.site)। বাংলাদেশি দুই তরুণ উদ্যোক্তা সাইফ কবির ও সাহেদ শরীফ তৈরি করেছেন প্ল্যাটফর্মটি।

২১ আগস্ট চালু হওয়া এই ওয়েবসাইটে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা ছাড়াই সরকারি দপ্তর, সেবার ধরন, এলাকা, দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ এবং ঘুষ দাবি বা লেনদেনের পর কী ঘটেছে—এসব তথ্য জানাতে পারেন ভুক্তভোগীরা। তবে কোনো কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর প্রকাশের সুযোগ নেই।

নির্মাতাদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা ‘ঘুষসাইট’-এর উদ্দেশ্য নয়। বরং সরকারি সেবা খাতে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দাবি বা ঘুষের একটি উন্মুক্ত পাবলিক রেকর্ড তৈরি করাই লক্ষ্য। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়মের ধরন বা প্যাটার্ন চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করছেন।

সাইফ কবির বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকেই ঘুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বা হিসাব সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। একই দপ্তরের বিষয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে সেখানে সেবা নিতে যাওয়া অন্যরা সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে আগেই ধারণা পাবেন।

ভারতের ‘bribes.fyi’ ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এ উদ্যোগের চিন্তা আসে বলে জানান সাইফ। তিনি বিষয়টি বন্ধু ও সহ-নির্মাতা সাহেদ শরীফকে জানানোর পর দুজন মিলে একদিনের মধ্যে বাংলাদেশি সংস্করণের ওয়েবসাইট তৈরি করেন।

সাইটে জমা পড়া প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৩ আগস্ট পর্যন্ত দেশের আট বিভাগে ৪৫৮টি রিপোর্ট জমা হয়েছে। এসব রিপোর্টে প্রায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২৫৪টি, চট্টগ্রামে ৯৮টি, সিলেটে ২৪টি, রাজশাহী ও খুলনায় ২২টি করে, ময়মনসিংহে ১৬টি, রংপুরে ১৫টি এবং বরিশালে ৭টি রিপোর্ট রয়েছে।

তবে এসব তথ্য সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারকারীদের নিজেদের দেওয়া এবং অযাচাইকৃত। ফলে এগুলোকে সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘুষের প্রকৃত বা স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন নির্মাতারা।

ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গড় ঘুষ দাবির পরিমাণ ৩৩ হাজার ৭৪৭ টাকা। জমি, কাস্টমস ও করসংক্রান্ত কয়েকটি ঘটনায় লাখ লাখ টাকা দাবির তথ্য আসায় গড় পরিমাণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সাইফ।

যেভাবে কাজ করে

অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে—এই পাঁচ ধরনের তথ্য দিতে হয়। চাইলে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণও দেওয়া যায়। পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো অ্যাকাউন্ট, নাম, ই-মেইল বা ফোন নম্বর প্রয়োজন হয় না এবং দুই মিনিটেরও কম সময়ে রিপোর্ট জমা দেওয়া যায়।

রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর সেটি সরাসরি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সরিয়ে ফেলা হয়। আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট বা নীতিমালা লঙ্ঘনকারী অভিযোগ বাদ দেওয়ার পর রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়।

প্রকাশিত তথ্য বিভাগ, দপ্তর, সেবার ধরন, দাবিকৃত অর্থ ও ফলাফলের ভিত্তিতে খোঁজা যায়।

সাইটে থাকা একটি অযাচাইকৃত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আরেকটি প্রতিবেদনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালী অঞ্চলে জন্মনিবন্ধনের জন্য ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের কোনোটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। সাইফ কবিরও প্রতিবেদনে তথ্যগুলো অযাচাইকৃত হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

সাইফের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযোগের চেয়ে একই দপ্তর বা সেবার বিষয়ে বহু মানুষের কাছ থেকে কাছাকাছি অঙ্কের ঘুষ দাবির তথ্য পাওয়া গেলে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন তৈরি হতে পারে। এই তথ্য সাধারণ সেবাগ্রহীতা, সাংবাদিক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য কাজে আসতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

ওয়েবসাইটটি নির্মাতাদের নিজস্ব অর্থায়নে এবং আংশিকভাবে ইচ্ছুক ব্যবহারকারীদের অনুদানে পরিচালিত হচ্ছে। তবে রিপোর্ট জমা দিতে কোনো ফি বা অনুদানের প্রয়োজন নেই।

নির্মাতারা জানিয়েছেন, সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করার বিকল্প হিসেবে ‘ঘুষসাইট’ তৈরি করা হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে রিপোর্টের সংখ্যা বাড়লে সরকারি সেবাখাতে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দাবি বা ঘুষের একটি বৃহত্তর চিত্র প্রকাশ্যে আসবে—এটাই তাদের প্রত্যাশা।