সোমবার

১৮ মে, ২০২৬ ৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

এআই ইন্ডাস্ট্রিতে ক্ষমতার লড়াই: আদালত, কর্পোরেট দ্বন্দ্ব ও ভবিষ্যৎ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ মে, ২০২৬ ১৪:০৫

শেয়ার

এআই ইন্ডাস্ট্রিতে ক্ষমতার লড়াই: আদালত, কর্পোরেট দ্বন্দ্ব ও ভবিষ্যৎ
ছবি সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু এই প্রযুক্তি কে তৈরি করবে, কে এর মালিক হবে এবং কে লাভবান হবে—এসব নিয়েই বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব চলছে।

ওপেনএআইয়ের বিবর্তন নিয়ে দুই বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যান আইনি লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছেন। অলাভজনক সংস্থা থেকে মুনাফালোভী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর কেন্দ্র করেই এই দ্বন্দ্ব।,

মাস্কের অভিযোগ, ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী অল্টম্যান ও প্রেসিডেন্ট ব্রকম্যান মানবতার কল্যাণের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘সম্পদ বানানোর যন্ত্রে’ পরিণত করেছেন। মাস্ক দাবি করেছেন, তিনি ওপেনএআইয়ে ৩৮ মিলিয়ন ডলার প্রাথমিক মূলধন দিয়েছিলেন। তিনি ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের কাছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন—যা দাতব্য শাখায় জমা হোক। এছাড়া ওপেনএআইকে অলাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া এবং অল্টম্যান ও ব্রকম্যানকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন।

টেসলা ও স্পেস-এক্সের প্রতিষ্ঠাতা মাস্ক জানান, ওপেনএআইয়ের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি ৩৮ মিলিয়ন ডলার প্রারম্ভিক মূলধন দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালে তিনি বোর্ড ছাড়ার পরপরই ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেলে চলে যায়। অন্যদিকে ওপেনএআইয়ের দাবি, মাস্ক এ পরিবর্তনের কথা আগে থেকেই জানতেন এবং সমর্থন করেছিলেন। তাদের মতে, মাস্ক নিজে সিইও হতে ব্যর্থ হওয়ার পর এখন ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজের এআই কোম্পানি ‘এক্সএআই’-কে এগিয়ে নিতে এ মামলা করেছেন।,

২০১৫ সালে গুগলকে টেক্কা দিয়ে মানবতার কল্যাণে এআই তৈরির লক্ষ্যে যাত্রা শুরু ওপেনএআইয়ের। ব্রকম্যানের অ্যাপার্টমেন্টের ল্যাব থেকে শুরু হওয়া সংস্থাটির বর্তমান বাজারমূল্য ৮৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই মামলা ওপেনএআইয়ের আইপিও পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং এআই নিয়ে মানুষের ভীতি আরও বাড়াতে পারে। রয়টার্সের মতে, আইপিওতে এদের বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারেও পৌঁছাতে পারে।

ওপেনএআই, মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, অ্যামাজন—এ পাঁচটি কোম্পানি এআই শিল্পের প্রধান চালিকাশক্তি। তবে তাদের সম্পর্ক জটিল। ওপেনএআই অলাভজনক হলেও এখন মাইক্রোসফটের ঘনিষ্ঠ মিত্র। অন্যদিকে গুগল ও মেটা নিজস্ব মডেল নিয়ে বাজারে আধিপত্য চায়।

বর্তমানে ওপেনএআই নিজেদের ‘পাবলিক বেনিফিট কর্পোরেশন’-এ রূপান্তর করেছে, যেখানে মূল অলাভজনক শাখার ২৬ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে। এই আইনি লড়াই কেবল দুই ধনকুবেরের দ্বন্দ্ব নয়, বরং এআইর নৈতিকতা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

সাম্প্রতিক সময়ে কপিরাইট নিয়ে বড় মামলা হয়েছে। লেখক, শিল্পী ও সংবাদ সংস্থারা দাবি করছে—এআই কোম্পানিগুলো তাদের লেখা, গান, ছবি বা নিবন্ধ ব্যবহার করে মডেল তৈরি করেছে, কিন্তু তাদের অনুমতি বা পারিশ্রমিক দেয়নি। যেমন:

১. নিউ ইয়র্ক টাইমস মামলা করেছে ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে, কারণ তাদের নিবন্ধ এআই ট্রেনিংয়ে ব্যবহার করা হয়েছে।

২. গেটি ইমেজেস মামলা করেছে স্টেবিলিটি এআই-এর বিরুদ্ধে, যারা লাইসেন্সবিহীন ছবি ব্যবহার করেছে।

৩. আদালতের রায় নির্ধারণ করবে এআই কোম্পানিগুলো কতটা স্বাধীনভাবে তথ্য ব্যবহার করতে পারবে। এটা পুরো শিল্পের জন্য টার্নিং পয়েন্ট হবে।

ভবিষ্যৎ কী

১. ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘এআই অ্যাক্ট’ পাস করেছে। আমেরিকা ও চীনও কঠোর নিয়ম আনছে।

২. বড়দের সঙ্গে টিকে থাকা কঠিন, তবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অভিনব সমাধান দিতে পারলে ছোট স্টার্টআপের জায়গা থাকবে।

৩. মেটার লামা ও অন্যান্য ওপেন মডেল প্রযুক্তি উন্মুক্ত করছে। ওপেনএআই ও গুগল তাদের সেরা মডেল গোপন রেখেছে। এই লড়াই আরও জোরালো হবে।

৪. এআইয়ের প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে ইউনিয়ন ও ভোক্তা সংগঠন সোচ্চার। ভবিষ্যতে এআই ব্যবহার ও কর নির্ধারণে জনমত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এআই ইন্ডাস্ট্রিতে ক্ষমতার লড়াই এখন শুধু ব্যবসার প্রতিযোগিতা নয়—এটি আদর্শ, আইন, সৃজনশীলতা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। আদালতের রায়, কোম্পানির কৌশল ও সাধারণ মানুষের দাবি মিলিয়ে এআইয়ের ভবিষ্যৎ গড়াবে। যেভাবে ইন্টারনেট বিগত শতকের সবচেয়ে বড় টেক বিপ্লব ছিল, এআই হবে একবিংশ শতকের তেমনই এক বিপ্লব—আর তার মালিকানা নিয়ে লড়াই তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।



banner close
banner close