চাঁদের পৃষ্ঠপ্রদক্ষিণকারী যুগান্তকারী অভিযান শেষে নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের চার নভোচারী আজ ভোরে সান ডিয়েগোর উপকূলে সফলভাবে অবতরণ করেছেন। গত ১ এপ্রিল যাত্রা শুরুর পর ১০ দিন ১২ ঘণ্টার মহাকাব্যিক অভিযান শেষে স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টা ৭ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় আজ ভোর ৬টা ৭ মিনিটে) প্রশান্ত মহাসাগরে ওরিয়ন ক্যাপসুলটি অবতরণ করে।
মিশনের নভোচারীরা হলেন—কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এবং মিশন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেন। চাঁদের পিছন দিকের এমন একটি দূরবর্তী স্থানে পৌঁছেছেন তাঁরা, যেখানে আগে কখনো কোনো মানুষ যায়নি।
ফিরতি যাত্রা ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ
মহাকাশযানের ফিরতি যাত্রা বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পর্যায় ছিল। ঘণ্টায় প্রায় ৩৮ হাজার ৬০০ কিলোমিটার বেগে—যা শব্দের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি—বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে হয় ওরিয়ন ক্যাপসুলকে। এই ১৩ মিনিটের অগ্নিময় অবতরণের সময় ক্যাপসুলের বাইরের তাপমাত্রা দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। নভোচারীদের সুরক্ষার একমাত্র অবলম্বন ছিল ক্যাপসুলের হিট শিল্ড ও গতি কমানোর প্যারাসুট।
পাইলট ভিক্টর গ্লোভার আগেই জানিয়েছিলেন, যেদিন মিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেদিন থেকেই তিনি ফিরতি যাত্রার কথা ভেবে আসছেন। তাঁর ভাষায়, ফিরতি সময় ক্যাপসুলটি গর্জন করতে করতে বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তরে প্রবেশ করবে এবং বায়ুর অণুগুলো প্রচণ্ড সংকুচিত হয়ে ক্যাপসুলের বাইরের অংশ উত্তপ্ত করে তুলবে।
হিট শিল্ড নিয়ে শঙ্কা কাটিয়েছেন বিজ্ঞানীরা
২০২২ সালের মনুষ্যবিহীন আর্টেমিস-১ অভিযানে ফেরার সময় ক্যাপসুলের হিট শিল্ডে গর্তের মতো দাগ ও ফাটল দেখা দিয়েছিল। এবারের যাত্রায় ব্যবহৃত হিট শিল্ড আগেরটির হুবহু নকল হওয়ায় বিজ্ঞানীরা শঙ্কায় ছিলেন। ফাটলের সমস্যা নভোচারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—কারণ হিট শিল্ড বিকল হলে মহাকাশযান ও ক্রুরা ভস্মীভূত হওয়ার আশঙ্কা থাকত।
এক বছরের বেশি সময় ধরে আগের হিট শিল্ডের সমস্যা তদন্ত ও বিশ্লেষণের পর নাসা আস্থা প্রকাশ করে। নাসার সহযোগী প্রশাসক অমিত ক্ষত্রিয় বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, আমরা যে পদ্ধতি, হিট শিল্ড, প্যারাসুট ও পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা তৈরি করেছি, তার ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। গত নয় দিনের প্রতিটি মুহূর্ত ফিরতি যাত্রার ওপর নির্ভর করছে।
উদ্ধার অভিযান ও পরবর্তী পদক্ষেপ
অবতরণের পরপরই একটি উদ্ধারকারী উড়োজাহাজ নভোচারীদের উদ্ধার করে। একজন ডুবুরি সমুদ্রে নেমে হিট শিল্ডের ছবি তোলেন, যা মিশনের কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রথম প্রমাণ দেবে। নাসা জানিয়েছে, ফিরতি যাত্রায় ওরিয়নের থ্রাস্টারগুলো সঠিকভাবে কাজ করেছে এবং নভোচারীরা অর্ধেকের বেশি পথ পাড়ি দেওয়ার পর নিরাপদে অবতরণ করেছেন।
পটভূমি: বাতিল থেকে সফলতায়
গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে দুবার উৎক্ষেপণ বাতিল হওয়ার পর অবশেষে ১ এপ্রিল উৎক্ষেপণ সম্ভব হয়। এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরে আর্টেমিস-১ অভিযানে কোনো মানুষ পাঠানো হয়নি। আর্টেমিস-২-এর সাফল্য নাসার প্রকৌশলীদের কল্পনাকেও হার মানিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চাঁদে সরাসরি অবতরণ এখনো বাকি; সেটি হবে আর্টেমিস-৩ অভিযানের লক্ষ্য, যা ২০২৬ সালের পর সম্ভব।
আরও পড়ুন:








