মঙ্গলবার

৩১ মার্চ, ২০২৬ ১৭ চৈত্র, ১৪৩২

ভিউ ও ভাইরাল ব্যবসা: গণতন্ত্রের নতুন চ্যালেঞ্জ?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩১ মার্চ, ২০২৬ ০৮:০৬

শেয়ার

ভিউ ও ভাইরাল ব্যবসা: গণতন্ত্রের নতুন চ্যালেঞ্জ?
ছবি সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরে ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মুক্ত ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্রের বিকাশ সম্ভব নয়—এ কথা প্রতিষ্ঠিত সত্য। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থান এই কাঠামোকে এক নতুন বাস্তবতায় দাঁড় করিয়েছে। এখন তথ্যপ্রবাহ আর কেবল মূলধারার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণে নেই; বরং ফেসবুক, ইউটিউব, এক্সসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে তথ্য বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম।

বিশেষ করে যেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত, সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিকল্প তথ্যসূত্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইতিহাসে বিভিন্ন সময়—যেমন আরব বসন্ত বা বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে—এই মাধ্যমের ইতিবাচক প্রভাবও দেখা গেছে। তবে এই শক্তির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন এক ঝুঁকি।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের প্রবণতা কম, বরং চটকদার, আবেগনির্ভর ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ‘ভিউ’ ও ‘ভাইরাল’ কেন্দ্রিক এই অর্থনৈতিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সত্যকে আড়াল করে মিথ্যা ও অপপ্রচারকে সামনে নিয়ে আসে। ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়, সামাজিক অস্থিরতা বাড়ে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। যুক্তিনির্ভর আলোচনার জায়গায় গালাগালি, বিদ্বেষ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ স্থান করে নিচ্ছে। ভিন্নমতকে সহ্য না করে প্রতিপক্ষকে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘দালাল’ আখ্যা দেওয়া এখন অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এতে করে রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, ভুয়া অ্যাকাউন্ট এবং বটের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ঘটনাও বাড়ছে। ‘ডিসইনফরমেশন’ এখন শুধু অনলাইন সমস্যা নয়; এটি বাস্তব জীবনে সহিংসতা ও সামাজিক সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশ-বিদেশে এমন বহু ঘটনার নজির রয়েছে, যেখানে গুজব প্রাণহানির মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, গুজব ছড়ানো, চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি ‘হানি ট্র্যাপ’-এর মতো কৌশল ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস বা চরিত্রহননের ঘটনাও ঘটছে, যা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই হুমকি।

এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে পুরোপুরি দোষারোপ না করে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—

প্রথমত, নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা সত্য ও মিথ্যা তথ্য আলাদা করতে সক্ষম হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের অ্যালগরিদম আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।

তৃতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে ইতিবাচক ও সহনশীল অনলাইন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে হবে।

চতুর্থত, সরকারকে এমন ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গণতন্ত্রের জন্য যেমন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে, তেমনি এটি বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। দায়িত্বশীল ব্যবহার, সচেতনতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।



banner close
banner close