ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে এক সত্য ও মিথ্যার আপসহীন লড়াইয়ের গল্প। যে লড়াই কোনো রাজ্য দখলের জন্য ছিল না, ছিল না কোনো ক্ষমতার মোহ। সেই সংগ্রামটি ছিল, সৃষ্টির গোলামি থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করে একমাত্র স্রষ্টার একত্ববাদের দিকে ফিরিয়ে আনার।
হ্যাঁ, মূর্তিপূজা এবং পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বুকে চলা নবী-রাসূলদের সেই ঐতিহাসিক ও আদর্শিক সংগ্রাম।
শিরক ইসলামে মহাপাপ
ইসলামি শরিয়তে মূর্তিপূজাকে সবচেয়ে বড় পাপ তথা শিরক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা লোকমানের ১৩ নম্বর আয়াতে হযরত লোকমান আলাইহিস সালামের সেই বিখ্যাত উপদেশ উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন, হে বৎস, আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর সাথে শরিক করা মহা জুলুম।
মূর্তিপূজা ও শিরককে ইসলামে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সূরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্য যেকোনো পাপ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।
মূর্তির চরম অক্ষমতা তুলে ধরে সূরা আল-হাজ্জের ৭৩ নম্বর আয়াতে এক ঐতিহাসিক উপমা পেশ করা হয়েছে। যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মানুষ! একটি উপমা দেওয়া হচ্ছে, মন দিয়ে শোনো: তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাকো, তারা সবাই একত্র হলেও একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না! আর মাছিটি যদি তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু কেড়ে নেয়, তবে তাও তারা উদ্ধার করতে পারবে না। কত দুর্বল অন্বেষণকারী আর কত দুর্বল অন্বেষিত!
একইভাবে, সূরা আল-মায়িদাহর ৭৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, বলুন, তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ইবাদত করো, যা তোমাদের কোনো ক্ষতি বা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না? অথচ আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
নূহ আলাইহিস সালামের যুগে মূর্তিপূজার সূচনা
মানবজাতির ইতিহাসে সর্বপ্রথম মূর্তিপূজার সূচনা হয়েছিল হযরত নূহ আলাইহিস সালামের যুগে। সূরা নূহের ২৩ নম্বর আয়াতের তথ্য অনুযায়ী, সেকালে ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক এবং নাসর নামে পাঁচটি মূর্তির পূজা করা হতো। হযরত নূহ আলাইহিস সালাম দীর্ঘ ৯৫০ বছর তাঁর জাতিকে এক আল্লাহর পথে ডাকার পরও তারা অবাধ্যতা অব্যাহত রাখায় মহাপ্লাবনে ধ্বংস হয়ে যায়।
ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সাহসী সংগ্রাম
পরবর্তীতে মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সাহসী অধ্যায়টি রচনা করেছিলেন হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। সূরা মারইয়ামের ৪২ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, তিনি তাঁর পিতাকে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে পিতা! আপনি কেন এমন জিনিসের ইবাদত করেন যা শোনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো উপকারে আসে না?
জাতির লোকেরা উৎসবের দিনে বাইরে গেলে, হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম উপাসনালয়ে ঢুকে কুঠার দিয়ে সব ছোট মূর্তি ভেঙে ফেলেন। সূরা আল-আম্বিয়ার ৫৮ ও ৬৩ নম্বর আয়াত নিশ্চিত করে, তিনি কুঠারটি ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন সবচেয়ে বড় মূর্তিটির কাঁধে। জাতি ফিরে এসে প্রশ্ন করলে তিনি তাদের যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, তোমাদের এই বড় মূর্তিটাই তো এটা করেছে, তাকেই জিজ্ঞেস করো না যদি সে কথা বলতে পারে!
তাঁর এই যুক্তির সামনে পৌত্তলিকরা লজ্জিত ও নিরুত্তর হলেও, তৎকালীন রাজা নমরুদ তাঁকে জীবন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে। তবে আল্লাহর নির্দেশে সেই ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা আগুন ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের জন্য শান্তিদায়ক বাগানে পরিণত হয়েছিল।
মুসা আলাইহিস সালাম ও সোনার বাছুর
একই ধারাবাহিকতায়, হযরত মুসা আলাইহিস সালাম তূর পাহাড়ে গেলে সামিরী নামক এক ব্যক্তির প্ররোচনায় বনী ইসরাঈল সোনার বাছুর পূজায় লিপ্ত হয়। মুসা আলাইহিস সালাম ফিরে এসে ক্ষুব্ধ হয়ে সেই স্বর্ণের বাছুরটি পুড়িয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন।
মক্কা বিজয়ে মূর্তি ধ্বংস
আর প্রামাণ্য ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমনের সময় পবিত্র মক্কা নগরী মূর্তিপূজার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। সহীহ বুখারীর ৪২৮০ নম্বর হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, তখন কাবা ঘরের চারপাশে লাত, মানাত, উজ্জা ও হুবালসহ প্রায় ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল।
দীর্ঘ ১৩ বছর মক্কার মাটিতে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার পর, অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দিনে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে লাঠি দিয়ে কাবার ভেতরের ও বাইরের মূর্তিগুলো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেন।
সহীহ বুখারীর ৪৭২০ নম্বর হাদিস ও সূরা আল-ইসরার ৮১ নম্বর আয়াতের তথ্যমতে, সে সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করছিলেন সেই ঐতিহাসিক বাণী, বলুন: সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়।
তাওহীদের চিরন্তন শিক্ষা
এভাবেই এক লাখ চব্বিশ হাজার নবী-রাসূলগণ যুগে যুগে মানুষকে মূর্তিপূজার অন্ধকারের বিপরীতে তাওহীদের আলোর বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তবে বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একটি বড় প্রশ্ন জনসমক্ষে উঠে আসে, এই জনপদের প্রায় আট থেকে দশ ভাগ মানুষ এখনও মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী।
ইসলামে ইবাদত ও আনুগত্যের মূল ভিত্তি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন ধর্মীয় বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ইসলামী আকাইদের মূল শিক্ষা অনুযায়ী সকল প্রকার ইবাদত ও সেজদা পাওয়ার একমাত্র যোগ্য মহান আল্লাহ তাআলা। আল্লাহর সত্তা ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি, মাজার কিংবা মূর্তির উদ্দেশ্যে সেজদা করা বা পূজা অর্চনা করাকে ইসলামে জঘন্য অপরাধ অর্থাৎ শিরক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:







