শুক্রবার

২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

ইসলামের চোখে ‘রুকইয়া’ শেখা ও ব্যবহার করা

বাংলা এডিশন ডেস্ক:

প্রকাশিত: ২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৪

আপডেট: ২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:০৬

শেয়ার

ইসলামের চোখে ‘রুকইয়া’ শেখা ও ব্যবহার করা
প্রতীকী ছবি

‘রুকইয়াহ’ অর্থ হলো ইসলামসম্মত ঝাড়ফুঁক এবং কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়া দিয়ে চিকিৎসা করা। নিজে নিজে বা কোনো সৎ ও বুজুর্গ ব্যক্তির মাধ্যমে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে চিকিৎসা করানোকে ‘রুকইয়াহ শারইয়াহ’ বলা হয়।

‘রুকইয়া’ শেখা শরিয়তসম্মত ও বৈধ। আশ-শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন আমাদের কাছে এলেন। তখন আমি হাফসা (রা.)-এর কাছে ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কি তাকে ‘নামলাহ’-এর রুকইয়া শেখাবে না, যেমন তুমি তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছ? (মুসনাদ আহমাদ, ২৭০৯৫; সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৮৭)

এখানে ‘নামলাহ’ বলতে এমন এক ধরনের চর্মরোগ/ঘা বোঝানো হয়েছে, যা শরীরের পার্শ্বদেশ বা অন্য স্থানে দেখা দিতে পারে।

এটি ছড়িয়ে পড়ার কারণে একে ‘নামলাহ’ বলা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আবার কেউ বলেছেন, এটি সামান্য ফোলাভাবসহ ছোট ছোট ফুসকুড়ি, যা পরে ঘায়ে পরিণত হয়; এরপর তা শুকিয়ে যায় এবং বিস্তৃত হতে পারে।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে শরিয়তসম্মত রুকইয়া শেখা এবং অন্যকে শেখানো বৈধ।

রুকইয়ায় বিশেষজ্ঞ হওয়া বৈধ

সাহাবিদের যুগে এমন ব্যক্তিদের অস্তিত্ব ছিল, যাঁরা রুকইয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন।

অতএব, মানুষের রুকইয়া করার জন্য নিয়মিতভাবে বসা বা এ কাজে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করাকে মূলত নিষিদ্ধ বলার সুযোগ নেই—যতক্ষণ রুকইয়া শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে থাকে।

এর কয়েকটি দলিল নিম্নরূপ—

১. আশ-শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.)

আশ-শিফা (রা.)-এর ‘নামলাহ’-এর রুকইয়ায় বিশেষ দক্ষতা ছিল। পূর্বোক্ত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে হাফসা (রা.)-কে সেই রুকইয়া শেখাতে বলেছিলেন। কুরাইব আল-কিন্দি বলেন, আলী ইবনুল হুসাইন (রহ.) তাঁর হাত ধরে কুরাইশের এক বৃদ্ধের কাছে গেলেন। সেখানে তিনি তাকে তাঁর মায়ের রুকইয়া সম্পর্কে বর্ণনা করতে বলেন।

তিনি জানান, তাঁর মা জাহেলি যুগে রুকইয়া করতেন। ইসলাম আসার পর তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুমতি না নেওয়া পর্যন্ত রুকইয়া করব না। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, রুকইয়া করো, যতক্ষণ তাতে শিরক না থাকে।

(সহিহ ইবনু হিব্বান, হাদিস : ৬০৯২)

এই হাদিস শুআইব আল-আরনাউত (রহ.) সহিহ বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে বর্ণনাকারী ‘আমার মা’ বলতে তাঁর নানি আশ-শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.)-কে বোঝাচ্ছেন। আরবদের প্রচলিত ভাষায় দাদা-দাদিকে ‘বাবা-মা’ বলা হতো।,

২. আওফ ইবনু মালিক আল-আশজাঈ (রা.)

আওফ ইবনু মালিক (রা.) বলেন, আমরা জাহেলি যুগে রুকইয়া করতাম। আমরা বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এ ব্যাপারে আপনার মত কী?’ তিনি বললেন, ‘তোমরা তোমাদের রুকইয়াগুলো আমার সামনে উপস্থাপন করো। শিরক না থাকলে রুকইয়ায় কোনো সমস্যা নেই।’ (মুসলিম, হাদিস : ২২০০)

এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) রুকইয়ার ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করেছেন—রুকইয়ায় শিরক থাকা যাবে না।

৩. উমাইর (রা.)—আবু আল-লাহমের মুক্তদাস

উমাইর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, আমি আমার মনিবদের সঙ্গে খায়বারে উপস্থিত ছিলাম। তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে আমার ব্যাপারে কথা বললেন এবং বললেন যে আমি একজন দাস। তিনি আমার ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন।... আমি তাঁর কাছে এমন একটি রুকইয়া পেশ করলাম, যা দিয়ে আমি পাগল/উন্মাদ ব্যক্তিদের রুকইয়া করতাম। তিনি আমাকে তার কিছু অংশ বাদ দিতে এবং কিছু অংশ রেখে দিতে নির্দেশ দিলেন। (তিরমিজি, হাদিস : ১৫৫৭; সুনানুল কুবরা, নাসাঈ : ৭৫৩৫)

এই হাদিস থেকেও বোঝা যায় যেকোনো ব্যক্তি রুকইয়া করার দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং মানুষের চিকিৎসায় তা ব্যবহার করতে পারে। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) রুকইয়ার বিষয়বস্তু যাচাই করে যতটুকু শরিয়তসম্মত নয়, তা বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

৪. আমর ইবনু হাজম (রা.)-এর পরিবার

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) রুকইয়া নিষেধ করেছিলেন। তখন আমর ইবনু হাজমের পরিবারের লোকেরা তাঁর কাছে এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের কাছে একটি রুকইয়া আছে, যার মাধ্যমে আমরা বিচ্ছুর দংশনের চিকিৎসা করি। কিন্তু আপনি তো রুকইয়া নিষেধ করেছেন।’ এরপর তারা সেই রুকইয়া তাঁর সামনে উপস্থাপন করল। তিনি বললেন, ‘আমি এতে কোনো সমস্যা দেখছি না। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের উপকার করতে পারে, সে যেন তার উপকার করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২১৯৯)

অন্যের কাছে রুকইয়া না চাওয়া মুস্তাহাব

ইসলামের চোখে রুকইয়া করা নিষিদ্ধ নয়; বরং কোরআন ও সুন্নাহসম্মত রুকইয়া বৈধ। তবে একজন ব্যক্তি নিজে থেকে অন্যের কাছে রুকইয়া চাওয়া পরিহার করলে পূর্ণতর তাওয়াক্কুলের মর্যাদা অর্জন করতে পারে।

রোগী নিজে অন্যের কাছে রুকইয়া করানোর জন্য না চাওয়াই উত্তম। এ বিষয়ে ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার সামনে বিভিন্ন উম্মতকে উপস্থিত করা হলো। কোনো নবীর সঙ্গে একজন, কোনো নবীর সঙ্গে দুজন, কোনো নবীর সঙ্গে একটি দল ছিল; আবার কোনো নবীকে এমন দেখা গেল, যাঁর সঙ্গে কেউ নেই। এরপর আমার সামনে একটি বিশাল জনসমুদ্র দেখা গেল, যা দিগন্ত ঢেকে দিয়েছিল। আমি আশা করলাম, এরা আমার উম্মত হবে। তখন বলা হলো, ‘এটি মুসা ও তাঁর জাতি।’ এরপর আমাকে বলা হলো, ‘দেখুন।’ আমি আবার একটি বিশাল জনসমুদ্র দেখলাম... তারপর বলা হলো, ‘এরা আপনার উম্মত। তাদের মধ্যে ৭০ হাজার ব্যক্তি এমন হবে, যারা বিনা হিসাবেই জান্নাতে প্রবেশ করবে।’

এরপর সাহাবিরা আলোচনা করতে লাগলেন—তাঁরা কারা? রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি জানতে পেরে বললেন,

তারা হলো সেই লোকেরা, যারা কুসংস্কার/অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করে না, অন্যের কাছে রুকইয়া চায় না, (চিকিৎসার জন্য) দাগ দিয়ে আগুনে পোড়ানোর চিকিৎসা গ্রহণ করে না এবং নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে। তখন উক্কাশা ইবনু মিহসান (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, আমি কি তাদের অন্তর্ভুক্ত?

তিনি বলেন, হ্যাঁ। আরেক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে একই প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, উক্কাশা তোমার আগে নিয়ে নিয়েছে। (বুখারি, হাদিস : ৫৭৫২)

তবে কেউ অসুস্থ হলে অন্য কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার ওপর শরিয়তসম্মত রুকইয়া করলে তা আর ‘রুকইয়া চাওয়া’র একই বিষয় নয়। একইভাবে প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণ করাও তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং শরিয়তসম্মত উপায় অবলম্বন করে ফলাফল আল্লাহর হাতে সোপর্দ করাই তাওয়াক্কুলের মূলনীতি।,