মঙ্গলবার

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

যেখানে প্রতিদিন ইবাদত করেন ৭০ হাজার ফেরেশতা

বাংলা এডিশন ডেস্ক:

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫১

শেয়ার

যেখানে প্রতিদিন ইবাদত করেন ৭০ হাজার ফেরেশতা
ছবি সংগৃহীত

মানুষের চোখের আড়ালে রয়েছে এমন এক বিশাল জগৎ, যার অনেক কিছুই কেবল কোরআন ও সহিহ হাদিসের বর্ণনা থেকেই জানা যায়। আকাশমণ্ডলীর সেই বিস্ময়কর জগতের অন্যতম নিদর্শন বায়তুল মামুর। সপ্তম আকাশে অবস্থিত এই পবিত্র ঘরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ফেরেশতা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন।

ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা বায়তুল মামুরে প্রবেশ করেন। ইবাদত শেষে তাঁরা বের হয়ে যান। এরপর আর কখনো সেখানে ফিরে আসার সুযোগ পান না। মিরাজের রাতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজ চোখে বায়তুল মামুর দেখেছেন।

বায়তুল মামুর কী

‘বায়ত’ অর্থ ঘর। আর ‘মামুর’ অর্থ আবাদ, জনবহুল বা যেখানে নিয়মিত মানুষের যাতায়াত রয়েছে। অর্থাৎ বায়তুল মামুর হলো এমন একটি আবাদ ঘর, যেখানে ফেরেশতাদের অবিরাম আনাগোনা ও ইবাদত রয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সুরা তুরে আল্লাহ তাআলা বায়তুল মামুরের শপথ করেছেন। আল্লাহ বলেন-

وَالْبَيْتِ الْمَعْمُورِ ۝ وَالسَّقْفِ الْمَرْفُوعِ ۝ وَالْبَحْرِ الْمَسْجُورِ ۝ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ لَوَاقِعٌ ۝ مَا لَهُ مِنْ دَافِعٍ

অর্থ: ‘শপথ বায়তুল মামুরের, সুউচ্চ ছাদের এবং উত্তাল সমুদ্রের। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালকের শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। তা প্রতিহত করার কেউ নেই।’

—সুরা তুর, আয়াত ৪–৮

মিরাজের রাতে দেখেছিলেন মহানবী (সা.)

বায়তুল মামুর সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা পাওয়া যায় মিরাজের সহিহ হাদিসে। মহানবী (সা.) সপ্তম আকাশে পৌঁছালে তাঁকে বায়তুল মামুর দেখানো হয়।

হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) হযরত জিবরাইল (আ.)-কে বায়তুল মামুর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন-

«هَذَا الْبَيْتُ الْمَعْمُورُ، يَدْخُلُهُ كُلَّ يَوْمٍ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ، إِذَا خَرَجُوا مِنْهُ لَمْ يَعُودُوا فِيهِ»

অর্থ: এটি বায়তুল মামুর। প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতা এতে প্রবেশ করেন। তারা একবার বের হয়ে গেলে আর কখনো এতে ফিরে আসেন না।’

—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২০৭

এই হাদিস আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বিশালতার একটি বিস্ময়কর চিত্র তুলে ধরে। প্রতিদিন নতুন ৭০ হাজার ফেরেশতা বায়তুল মামুরে ইবাদতের জন্য প্রবেশ করেন। তাঁদের প্রত্যেক দল একবার সেখানে যাওয়ার পর আর ফিরে আসে না।,

ফেরেশতাদের ইবাদতের পবিত্র স্থান

মুফাসসিরদের ব্যাখ্যায়, বায়তুল মামুর ফেরেশতাদের ইবাদতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান। পৃথিবীতে মুসলমানরা যেমন পবিত্র কাবাঘরকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ ও ইবাদত করেন, তেমনি আসমানের ফেরেশতারা বায়তুল মামুরে ইবাদত করেন।

তাফসিরে ইবনে কাসিরে সহিহ হাদিসের আলোকে বায়তুল মামুরে ফেরেশতাদের ইবাদত ও তাওয়াফের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অদৃশ্য জগতের বিষয় হওয়ায় বায়তুল মামুরের আকৃতি, গঠন বা অবস্থান সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, ততটুকুতেই বিশ্বাস সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। অনুমাননির্ভর অতিরিক্ত কোনো বিবরণকে ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ বানানো ঠিক নয়।

কাবাঘরের সঙ্গে কী সম্পর্ক

মুফাসসিরদের বিভিন্ন বর্ণনায় বায়তুল মামুরকে কাবাঘরের সরাসরি ওপরের দিকে সপ্তম আকাশে অবস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পৃথিবীতে কাবাঘর এবং আসমানে বায়তুল মামুরের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাদৃশ্যের কথা বলা হয়।

দুনিয়ায় মানুষ কাবাঘরকে কেন্দ্র করে আল্লাহর ইবাদত করেন। আর আসমানে ফেরেশতারা বায়তুল মামুরে ইবাদত করেন। তবে বায়তুল মামুরের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও গঠন সম্পর্কে সহিহ সূত্রে যতটুকু বর্ণনা রয়েছে, তার বাইরে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা উচিত নয়।

বায়তুল মামুরের কাছে ইব্রাহিম (আ.)

মিরাজের রাতে সপ্তম আকাশে মহানবী (সা.) হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, তিনি বায়তুল মামুরের কাছে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে দেখতে পান।

এই ঘটনাও মিরাজের বিস্ময়কর ঘটনাবলির অন্যতম অংশ। একই সঙ্গে এটি বায়তুল মামুরের মর্যাদা ও আসমানি জগতের সঙ্গে এর সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আনে।

আল্লাহর সৃষ্টির বিশালতার এক নিদর্শন

বায়তুল মামুর মানুষের চোখের আড়ালের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। প্রতিদিন ৭০ হাজার ফেরেশতার সেখানে প্রবেশ, ইবাদত এবং এরপর আর ফিরে না আসার বর্ণনা আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বিশালতা উপলব্ধির সুযোগ দেয়।

মিরাজের রাতে মহানবী (সা.)-এর বায়তুল মামুর প্রত্যক্ষ করার ঘটনা মুমিনের জন্য আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, অদৃশ্য জগতের বাস্তবতা এবং ফেরেশতাদের বিপুল সংখ্যার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।