বিশ্বমঞ্চে পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াতে বাংলাদেশের হাফেজদের কণ্ঠে যখন সাফল্যের বার্তা আসে, তখন গর্বে ভরে ওঠে পুরো দেশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজরা অর্জন করছেন সাফল্য, তুলে ধরছেন লাল-সবুজের পতাকা।
এসব সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সাধনা, নিয়মিত অনুশীলন, শুদ্ধ তেলাওয়াতের চর্চা এবং ওস্তাদদের নিবিড় তত্ত্বাবধান। এই নীরব প্রচেষ্টার অন্যতম প্রতিষ্ঠান হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। শুরুতে হিফজখানার শিক্ষকদের নিয়ে ৪০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হলেও সময়ের সঙ্গে সেই কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
শিক্ষার্থী ও ওস্তাদদের প্রশিক্ষণ
শুধু শিক্ষার্থী নয়, প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ওস্তাদদেরও। শুদ্ধ তেলাওয়াত, মুখস্থের মান উন্নয়ন এবং কোরআন শিক্ষার পদ্ধতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে বিভাগীয় পর্যায়ে পাঁচ, ১০ ও ২০ দিনব্যাপী বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় রয়েছে ৪০ দিনব্যাপী একাধিক কোর্স। এরই ধারাবাহিকতায় এবার ফেনীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পাঁচ দিনব্যাপী হিফজ ছাত্র প্রশিক্ষণ কোর্স।
ফেনী জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় আয়োজিত এই প্রশিক্ষণে জেলার ৯০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক হাজার হিফজ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন। তাদের চোখে বড় স্বপ্ন, পবিত্র কোরআনকে আরও শুদ্ধভাবে হৃদয়ে ধারণ করা এবং একদিন বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। সেই লক্ষ্যেই প্রতিদিন চলছে আয়াত মুখস্থ করা, শুদ্ধ উচ্চারণে তেলাওয়াত এবং নির্ভুলভাবে তা উপস্থাপনের অনুশীলন।
জামিয়া রশিদিয়া মাদ্রাসার পক্ষ থেকে ছাত্র, শিক্ষক ও কমিটির সদস্যরা এই আয়োজনকে কোরআনের খেদমত হিসেবে নিয়েছেন। গত তিন বছর ধরে এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কোরআন শিক্ষায় আরও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানান ফেনীর জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম আল্লামা মুমিনুল হক জাদিদ।
বিশ্বমঞ্চে সাফল্যের প্রস্তুতি
এই প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠছেন এমন সব হাফেজ, যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাংলাদেশের কিশোর হাফেজদের সাফল্য এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হচ্ছে।
পবিত্র কোরআনের আয়াত যখন তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, তখন তা শুধু একটি প্রতিযোগিতার অংশ থাকে না; বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় শিক্ষার একটি সুন্দর পরিচয়ও তুলে ধরে। আর এই সাফল্যের পেছনে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন অসংখ্য ওস্তাদ, শিক্ষক ও প্রশিক্ষক। তাদের ধৈর্য, মেহনত ও ভালোবাসায় গড়ে উঠছেন একেকজন হাফেজে কোরআন।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই প্রশিক্ষণ শুধু প্রতিযোগিতায় ভালো করার প্রস্তুতি নয়; বরং কোরআন তেলাওয়াতের শুদ্ধতা, মুখস্থের দৃঢ়তা এবং নিয়মিত চর্চার সুযোগও তৈরি করছে।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দক্ষতা আরও বাড়ছে। শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত ও পড়ার মান উন্নয়নে এ ধরনের প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম বলে জানান হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশনের সিনিয়র প্রশিক্ষক হাফেজ কারী আবদুল কাদের।
হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবদুল্লাহ বলেন, তাদের এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা থানা, জেলা, বিভাগীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্যও সম্মান বয়ে আনছেন।
শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ছে
হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শায়খ আব্দুল হক বাংলা এডিশনকে জানান, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের দক্ষতা ও পাঠদানের মান বাড়ছে। পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসা ও হিফজখানাকে ঘিরে কোনো ঘটনা ঘটলে অপপ্রচারের বদলে সত্যতা যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি। কোনো অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে বলেও জানান তিনি।
কোরআনের হিফজ শুধু একটি শিক্ষাপদ্ধতি নয়; মুসলিমদের কাছে এটি ইবাদত, আমানত ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার এক মহৎ প্রচেষ্টা। সেই শিক্ষাকে আরও শুদ্ধ ও সমৃদ্ধ করতে প্রশিক্ষণের এই আয়োজন। আর এমন সাধনা থেকেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের হাফেজদের সাফল্যের গল্প যেন প্রতিনিয়ত আরও বড় হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন:







