একটি শিশুর জন্ম কোন পরিস্থিতিতে হয়েছে, তা তার নিজের সিদ্ধান্ত নয়। অথচ বড়দের ভুলের দায় অনেক সময় সমাজের চোখে এসে পড়ে সেই নিষ্পাপ শিশুটির ওপর। ইসলাম এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত ন্যায়সংগত ও মানবিক অবস্থান গ্রহণ করেছে—কোনো শিশু তার বাবা-মায়ের গুনাহের জন্য দায়ী নয়। একই সঙ্গে সন্তানের নাসাব বা বংশপরিচয় সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও শরিয়ত সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে।
তাই কোনো নারী বিয়ের আগে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অন্য একজন পুরুষকে বিয়ে করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—সেই সন্তানের নাসাব কার সঙ্গে যুক্ত হবে? জৈবিক পিতা কি শরিয়তের দৃষ্টিতে সন্তানের পিতা হিসেবে গণ্য হবেন, নাকি মায়ের পরবর্তী স্বামীর সঙ্গে পিতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি হবে? এ প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে নাসাব, ভরণপোষণ এবং লালন-পালন—এই তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।
বিয়ের আগে সন্তান জন্ম নিলে নাসাব কার সঙ্গে যুক্ত হবে?
যদি সন্তানের জন্মের সময় মায়ের কোনো বৈধ বিবাহ না থাকে, তাহলে ‘ফিরাশ’-এর ভিত্তিতে কোনো স্বামীর সঙ্গে সন্তানের পিতৃনাসাব প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন থাকে না।
জমহুর ফকিহের মতে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানের শরিয়তসম্মত পিতৃনাসাব জৈবিক পুরুষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং তার নাসাব মায়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে উত্তরাধিকারসহ নাসাবভিত্তিক অন্যান্য বিধানও সেই অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
তবে এ বিষয়ে ফিকহে একটি উল্লেখযোগ্য মতভেদও রয়েছে। কিছু আলেমের মতে, নারী অবিবাহিত থাকলে এবং জৈবিক পুরুষ নিজে সন্তানকে স্বীকার করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার সঙ্গে নাসাবের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। তাই বাস্তব কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির কাছে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ দিয়ে ফতোয়া নেওয়া উত্তম।
মায়ের পরবর্তী স্বামী কি শিশুটির পিতা হয়ে যাবেন?
মায়ের পরবর্তী স্বামী শিশুটিকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে ও লালন-পালন করতে পারেন। তার খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়া অত্যন্ত প্রশংসনীয় মানবিক কাজ। কিন্তু শুধু শিশুটির মাকে বিয়ে করার কারণে তিনি শরিয়তগতভাবে শিশুটির পিতা হয়ে যাবেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
ٱدْعُوهُمْ لِـَٔابَآئِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ ٱللَّهِ ۚ فَإِن لَّمْ تَعْلَمُوٓاْ ءَابَآءَهُمْ فَإِخْوَٰنُكُمْ فِى ٱلدِّينِ وَمَوَٰلِيكُمْ
‘তোমরা তাদের পিতাদের নামে ডাকো; এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সংগত। যদি তোমরা তাদের পিতাদের না জানো, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই এবং তোমাদের ঘনিষ্ঠজন।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫)
অতএব, নতুন স্বামী শিশুটির অভিভাবকসুলভ দায়িত্ব পালন করতে পারেন, কিন্তু লালন-পালনের সম্পর্ককে নাসাবের সম্পর্কের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।
ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকারের বিধান
জমহুর ফকিহের মত অনুযায়ী, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্ম নেওয়া সন্তানের জৈবিক পুরুষের সঙ্গে শরিয়তসম্মত পিতৃনাসাব প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় পিতৃত্বের ভিত্তিতে তার ওপর সাধারণ পিতা-পুত্রের মতো ভরণপোষণের বিধানও প্রতিষ্ঠিত হয় না। সন্তানের নাসাব মায়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তার ভরণপোষণ ও লালন-পালনের বিষয়টি মাতৃপরিবার ও সংশ্লিষ্ট শরিয়তগত বিধানের আলোকে বিবেচিত হবে।
একই কারণে জৈবিক পুরুষের সঙ্গে সাধারণ পিতা-পুত্রের মতো উত্তরাধিকার সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয় না—জমহুরের মত অনুযায়ী। তবে কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় সন্তানকে হিবা করতে পারেন। একইভাবে, মৃত্যুর পর সম্পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত অসিয়ত করার সুযোগ রয়েছে, যার নিজস্ব বিধান আছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি- নাসাবের এই বিধান শিশুকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখার অনুমতি দেয় না। তার খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও লালন-পালনের ব্যবস্থা করা জরুরি। মায়ের পরবর্তী স্বামী স্বেচ্ছায় এসব দায়িত্ব গ্রহণ করলে তা অবশ্যই প্রশংসনীয় ও সওয়াবের কাজ হতে পারে।
শিশুর জন্মের দায় শিশুর নয়
ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো-কেউ অন্যের অপরাধের বোঝা বহন করবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌۭ وِزْرَ أُخْرَىٰ
‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১৬৪)
অতএব, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্ম নেওয়া কোনো শিশুকে তার জন্মের পরিস্থিতির কারণে অপমান, হেয় বা সামাজিকভাবে বঞ্চিত করা ইসলামের ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সে কোনো গুনাহ করেনি। তার সম্মান, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে।
পিতৃত্ব নির্ধারণে ইসলামের মূলনীতি
সন্তানের নাসাব নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ঘোষণা করেছেন—
الْوَلَدُ لِلْفِرَاشِ، وَلِلْعَاهِرِ الْحَجَرُ
‘সন্তান বৈধ দাম্পত্য-শয্যার অধিকারীর; আর ব্যভিচারীর জন্য রয়েছে বঞ্চনা।’ (বুখারি ২০৫৩)
এই হাদিসের ভিত্তিতে ইসলামি ফিকহে ‘আল-ওয়ালাদু লিল-ফিরাশ’ নীতি সুপরিচিত। এখানে ‘ফিরাশ’ বলতে বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কোনো বৈধ বিবাহ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সন্তানের নাসাব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বৈধ দাম্পত্যই মূল ভিত্তি।
এ কারণে কোনো বিবাহিত নারী সন্তান জন্ম দিলে স্বামী কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করতে পারেন না। এ ধরনের বিশেষ পরিস্থিতিতে শরিয়তে লিআন-এর বিধান রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ وَلَمْ يَكُن لَّهُمْ شُهَدَاءُ إِلَّا أَنفُسُهُمْ فَشَهَادَةُ أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شَهَادَاتٍۭ بِاللَّهِ ۙ إِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ وَالْخَامِسَةُ أَنَّ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَيْهِ إِن كَانَ مِنَ الْكَاذِبِينَ وَيَدْرَأُ عَنْهَا الْعَذَابَ أَن تَشْهَدَ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍۭ بِاللَّهِ ۙ إِنَّهُ لَمِنَ الْكَاذِبِينَ وَالْخَامِسَةَ أَنَّ غَضَبَ اللَّهِ عَلَيْهَا إِن كَانَ مِنَ الصَّادِقِينَ
‘যারা নিজেদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয় অথচ নিজেদের ছাড়া তাদের কোনো সাক্ষী নেই, তাদের প্রত্যেকের সাক্ষ্য হলো—সে আল্লাহর নামে চারবার শপথ করে বলবে যে, সে অবশ্যই সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবার বলবে, যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার ওপর আল্লাহর লানত। আর স্ত্রীর শাস্তি দূর হবে যদি সে আল্লাহর নামে চারবার শপথ করে বলে যে, সে অবশ্যই মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর পঞ্চমবার বলবে, যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ।’ (সুরা আন-নুর: আয়াত ৬–৯)
শিশুকে ‘অপরাধী’ বানানো যাবে না
শিশুর জন্মের পরিস্থিতি তার নিজের হাতে ছিল না। তাই তার জন্মের ঘটনা সামনে এনে তাকে অপমান করা, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা মানসিকভাবে কষ্ট দেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচার ও মানবিকতার পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ وَيُنَصِّرَانِهِ وَيُمَجِّسَانِهِ
‘প্রতিটি শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে; অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা মাজুসি বানায়।’ (মুসলিম ২৬৫৮)
এই হাদিস শিশুর স্বাভাবিক ও নির্দোষ অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই বড়দের ভুলের দায় কোনোভাবেই শিশুর ওপর চাপানো উচিত নয়।
নাসাব, দায়িত্ব ও ভালোবাসা—তিনটি বিষয় আলাদা। এখানে মূল বিষয়টি সহজভাবে এভাবে বোঝা যায়-
প্রথমত-নাসাব
বিয়ের আগে জন্ম নেওয়া সন্তানের ক্ষেত্রে জমহুর ফকিহের মতে তার শরিয়তসম্মত নাসাব মায়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবে; জৈবিক পুরুষের সঙ্গে পিতৃনাসাব প্রতিষ্ঠিত হবে না।
দ্বিতীয়ত-লালন-পালন ও দায়িত্ব
শিশুটিকে কে ভালোবাসবে, কে তার শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যয় বহন করবে, কে তাকে নিরাপদ পরিবেশে বড় করবে-এগুলো নাসাবের প্রশ্ন থেকে আলাদা। মায়ের পরবর্তী স্বামী কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা এসব দায়িত্ব আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে পারেন।
তৃতীয়ত-উত্তরাধিকার
পিতৃনাসাব প্রতিষ্ঠিত না হলে জৈবিক পুরুষের সঙ্গে সাধারণ পিতা-পুত্রের মতো উত্তরাধিকার সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হবে না। তবে হিবা ও শরিয়তসম্মত অসিয়তের মাধ্যমে সম্পদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিয়ের আগে জন্ম নেওয়া কোনো শিশু তার জন্মের পরিস্থিতির জন্য দায়ী নয়। তাই ইসলামের বিধান বোঝার সময় নাসাবের সংরক্ষণ এবং শিশুর মর্যাদা ও অধিকার—দুটিকে একসঙ্গে দেখতে হবে। শরিয়ত যেখানে বংশপরিচয়ের সঠিকতা রক্ষা করেছে, সেখানে একই সঙ্গে শিশুর ওপর অন্যের গুনাহের দায় চাপানোর পথও বন্ধ করেছে।
মায়ের পরবর্তী স্বামী শিশুটির জীবনে একজন স্নেহশীল অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারেন; তার শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিতে পারেন। কিন্তু শুধু মাকে বিয়ে করার কারণে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়তগত পিতা হয়ে যাবেন না। অন্যদিকে, জৈবিক সম্পর্ক থাকলেও জমহুরের মতে শুধু সেই জৈবিক সম্পর্কের কারণে পিতৃনাসাব, উত্তরাধিকার ও পিতৃত্বভিত্তিক বিধান প্রতিষ্ঠিত হয় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো-অপরাধের দায় অপরাধীর, শিশুর নয়। একটি শিশুর পরিচয়ের সঙ্গে তার জন্মের পরিস্থিতিকে জুড়ে দিয়ে তাকে সারাজীবন লজ্জা, অপমান ও বঞ্চনার মধ্যে রাখা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং তার প্রতি ভালোবাসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা পরিবার ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
নাসাবের বিধান তার জায়গায় থাকবে, কিন্তু মানবিকতা, মমতা ও দায়িত্বশীলতার জায়গায় কোনো ঘাটতি থাকা উচিত নয়। কারণ একটি শিশুর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো-সে যেন বড়দের ভুলের শাস্তি না পেয়ে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন:








