বৃহস্পতিবার

১১ জুন, ২০২৬ ২৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

পারিবারিক জীবন সুখময় করার জরুরি আমল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬ ০৮:০৬

শেয়ার

পারিবারিক জীবন সুখময় করার জরুরি আমল
ছবি সংগৃহীত

মানুষের জীবনে শান্তি, ভালোবাসা ও স্বস্তির সবচেয়ে বড় ঠিকানা হলো পরিবার। একটি সুখী পরিবার শুধু স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবনে প্রশান্তি আনে না; বরং তা সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ, সমাজের স্থিতিশীলতা এবং জাতির কল্যাণের ভিত্তিও রচনা করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে পারিবারিক অশান্তি, বিবাদ, বিচ্ছেদ এবং মানসিক দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হলো ধৈর্যের অভাব, আত্মত্যাগের সংকীর্ণতা, অতিরিক্ত স্বাধীনতার ভুল ধারণা এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের ঘাটতি।

ইসলাম পরিবারকে শুধু সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে আল্লাহর একটি বিশেষ নেয়ামত ও শান্তির উৎস হিসেবে ঘোষণা করেছে। কুরআন-হাদিসে এমন কিছু নীতি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যা অনুসরণ করলে সংসার হতে পারে শান্তিময়, সুখী ও বরকতময়।

পরিবারে শান্তির মূল ভিত্তি: ধৈর্য

সংসার জীবনে সব সময় একরকম পরিস্থিতি থাকে না। কখনো সুখ, কখনো দুঃখ; কখনো স্বাচ্ছন্দ্য, কখনো সংকট— এসব নিয়েই পারিবারিক জীবন। তাই একটি পরিবার টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য। মহান আল্লাহ বলেন—

وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

‘তোমরা ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আল-আনফাল: আয়াত ৪৬)

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতভেদ হতেই পারে। কিন্তু সাময়িক রাগ বা অভিমানের কারণে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ

‘ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোনো নেয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (বুখারি)

সুখী সংসারের জন্য প্রয়োজন ত্যাগ ও উদারতা

যে সংসারে সবাই শুধু নিজের অধিকার খোঁজে, সেখানে ভালোবাসা টিকে না। বরং যে পরিবারে সদস্যরা একে অপরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, সেখানে সম্পর্ক আরও গভীর ও মজবুত হয়। মহান আল্লাহ মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন—

وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ

‘তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদেরকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়।’ (সুরা আল-হাশর: আয়াত ৯)

সংসারে কখনো স্বামীকে ত্যাগ করতে হয়, কখনো স্ত্রীকে। কখনো নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিতে হয় পরিবারের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য। এই ত্যাগই দাম্পত্য জীবনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে।

অতিরিক্ত স্বাধীনতার ভুল ধারণা পরিহার

ইসলাম ব্যক্তি স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে সীমাহীন স্বাধীনতাকে নয়। বর্তমানে অনেক পারিবারিক সংকটের পেছনে রয়েছে ‘আমি আমার মতো চলব’ মানসিকতা। স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। সংসার জীবন শুধু অধিকার আদায়ের নাম নয়; বরং দায়িত্ব পালনেরও নাম। মহান আল্লাহ বলেন—

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ

‘নারীদের জন্য ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর দায়িত্ব রয়েছে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২৮)

পরিবারে যদি প্রত্যেকে শুধু নিজের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও সীমারেখা মেনে চললে পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্বামী-স্ত্রীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে আদর্শ সংসার

ইসলাম স্বামী-স্ত্রীকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে পরিচয় করিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنْتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ

‘তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৭)

পোশাক যেমন মানুষকে আচ্ছাদিত করে, সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং সুরক্ষা দেয়, তেমনি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও হওয়া উচিত পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে। আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً

‘তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আর-রূম: আয়াত ২১)

সংসারে স্বামী-স্ত্রী যদি একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করেন, পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব রাখেন, তাহলে অধিকাংশ সমস্যাই সহজে সমাধান হয়ে যায়।

উত্তম চরিত্রই সুখী দাম্পত্য জীবনের চাবিকাঠি

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি ৩৮৯৫)

আমলি দোয়া

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে উত্তম আচরণ, নম্রতা, ক্ষমাশীলতা ও সদাচরণ সুখী সংসারের অন্যতম প্রধান উপাদান। তাই পারিবারিক শান্তি, নেক সন্তান এবং সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য কুরআনের এই দোয়াটি নিয়মিত পড়া যেতে পারে—

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

উচ্চারণ: ‘রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াঝিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা ক্বুররাতা আ’ইউনিওঁ ওয়াঝআ’লনা লিলমুত্তাক্বিনা ইমামা।’

অর্থ: ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।’ (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ৭৪)

একটি সুখী পরিবার কখনো কেবল অর্থ-সম্পদ দিয়ে গড়ে ওঠে না; বরং ধৈর্য, ত্যাগ, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আল্লাহভীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। সংসারে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু ধৈর্যের মাধ্যমে তা সামাল দেওয়া, নিজের কিছু চাওয়া বিসর্জন দেওয়া এবং একে অপরকে বুঝে চলাই প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়।

যে পরিবার কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষাকে ধারণ করে, সেখানে ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়, সম্পর্ক মজবুত হয় এবং আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। তাই আসুন, আমরা নিজেদের পরিবারকে ইসলামের আলোকে গড়ে তুলি এবং ধৈর্য, ত্যাগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি শান্তিময়, সুখী ও জান্নাতমুখী পরিবার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের পরিবারগুলোকে ভালোবাসা, শান্তি, বরকত ও কল্যাণে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।



banner close
banner close