সোমবার

৮ জুন, ২০২৬ ২৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ইসলামী আইনে মা-বাবার ভরণ-পোষণ

ইসলাম ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮ জুন, ২০২৬ ০৭:৩৮

শেয়ার

ইসলামী আইনে মা-বাবার ভরণ-পোষণ
ছবি সংগৃহীত

ইসলামী শরিয়তে মা-বাবার সম্মান, মর্যাদা ও যত্ন অনিবার্য। ইসলাম সন্তানের জন্য মা-বাবাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করেছে।

নিষিদ্ধ করেছে তাঁদের প্রতি ন্যূনতম অসদাচরণকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে উফ পর্যন্ত বোলো না এবং তাদেরকে ধমক দিয়ো না। তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বোলো।

(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)

ভরণ-পোষণের বিধান

এই বিষয়ে ফকিহরা একমত যে শর্ত সাপেক্ষে সন্তানের জন্য মা-বাবার ভরণ-পোষণ প্রদান করা ওয়াজিব, যা কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস দ্বারা প্রমাণিত। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘লোকে কি ব্যয় করবে সে সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে। বোলো, যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করবে তা মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন এবং মুসাফিরদের জন্য। উত্তম কাজের যা কিছু তোমরা করো না কেন আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।

(সুরা : বাকারা, আয়াত : ২১৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানের উপার্জনে মা-বাবার অধিকার ঘোষণা করে বলেন, ‘মানুষের জন্য উওম খাবার হলো তার নিজের হাতে অর্জিত খাদ্য এবং তার সন্তানের আয়ও নিজের উপার্জনের মতো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫২৮)

জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-কে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার সম্পদ আছে, সন্তানও আছে। আমার পিতা আমার সম্পদের মুখাপেক্ষী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি ও তোমার সম্পদ সবই তোমার পিতার।’

(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৯১)

আল্লামা ইবনে মুনজির (রহ.) বলেন, ‘উম্মতের আলেমরা এই বিষয়ে একমত, যে মা-বাবার উপার্জন নেই, সম্পদও নেই তাদের ভরণ-পোষণ দেওয়া সন্তানের জন্য আবশ্যক।

(আল ইজমা, পৃষ্ঠা-১১০)

কন্যাসন্তান দায়মুক্ত নয়

আমাদের সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে মা-বাবার ভরণ-পোষণ প্রদানে কন্যাসন্তানের কোনো দায় নেই। কিন্তু চার মাজহাবের সম্মিলিত মত হলো, পুত্রসন্তানের মতো মা-বাবার দায়িত্ব কন্যাসন্তানের ওপরও বর্তায়। এ ক্ষেত্রে হানাফি মাজহাবের মত হলো, কন্যারা পুত্রসন্তানের সমান দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তবে হাম্বলি মাজহাবে বলা হয়েছে, পুত্র ও কন্যারা মিরাস অনুপাতে দায়িত্ব গ্রহণ করবে। অর্থাৎ কন্যার দায়িত্ব ছেলের অর্ধেক। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৬২৩; আল মুগনি : ৮/২১৯)

ভরণ-পোষণ লাভের শর্ত

ইসলামী শরিয়ত দুটি মৌলিক শর্তে সন্তানের ওপর মা-বাবার ভরণ-পোষণ প্রদান করা ওয়াজিব করেছে। তা হলো—

১. সন্তান সামর্থ্যবান হওয়া : সর্বসম্মতিক্রমে ভরণ-পোষণ ওয়াজিব হওয়ার জন্য সন্তানের সামর্থ্যবান হওয়া শর্ত। হানাফি মাজহাব অনুসারে সন্তান যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয় এবং তার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকে অথবা সন্তানের সম্পদ নেই, কিন্তু এমন উপার্জন থাকে যা দ্বারা নিজের ও পরিবারের (স্ত্রী ও সন্তান) ব্যয় নির্বাহ করার পরও অর্থ বেঁচে যায়, তবে সন্তান সামর্থ্যবান বলে বিবেচিত হবে। এমন সন্তানের ওপর মা-বাবা ভরণ-পোষণ দেওয়া আবশ্যক। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৬২২; আল বাহরুর রায়িক : ৪/২২৪)

২. মা-বাবা অভাবগ্রস্ত হওয়া : এই বিষয়েও আলেমরা একমত যে সন্তানের কাছ থেকে ভরণ-পোষণ লাভ করার জন্য মা-বাবার অভাবগ্রস্ত হওয়া শর্ত। আর তাদের অভাবগ্রস্ত হওয়ার অর্থ হলো তাদের সম্পদ ও উপার্জন না থাকা। চাই তারা উপার্জনে সক্ষম হোক বা না হোক। (আল বাহরুর রায়িক : ৪/২২৩; আল মুগনি : ৮/২১৩)

এ ছাড়া ভরণ-পোষণ আবশ্যক হওয়ার জন্য ফকিহরা আরেকটি শর্তারোপ করেন। তা হলো ব্যয়কারী ব্যয় গ্রহণকারীর ওয়ারিশ হওয়া। কোনো কারণে যদি ব্যক্তি ওরাসাত থেকে বঞ্চিত হয় তবে তার জন্য ভরণ-পোষণ দেওয়া আবশ্যক নয়। যেমন—ইসলামী শরিয়তের আলোকে দাদার আগে পিতা মারা গেলে নাতি দাদার সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়। এমন অবস্থায় নাতির জন্য দাদার ভরণ-পোষণ প্রদান করা আবশ্যক নয়। কিন্তু নাতির যদি কোনো চাচা না থাকে, তখন তার ওপর দাদার দায়িত্ব অর্পিত হবে। কেননা চাচার অনুপস্থিতিতে সে দাদার মিরাস লাভ করে থাকে। (আল মুগনি : ১১/৩৭৪)

মা-বাবা দ্বারা উদ্দেশ্য

ফকিহ আলেমরা বলেন, সন্তানের জন্য মা-বাবার ভরণ-পোষণ দেওয়া আবশ্যক। আর মা-বাবা দ্বারা উদ্দেশ্য ব্যক্তির জন্মদাতা বাবা ও গর্ভধারিণী মা। একইভাবে বাবার সূত্রে দাদা-দাদি এবং মায়ের সূত্রে নানা-নানি ভরণ-পোষণ লাভ করবে। তবে মালেকি মাজহাবের মত হলো, শুধু মা ও বাবাই সন্তানের কাছ থেকে ভরণ-পোষণ লাভ করবে, দাদা-দাদি ও নানা-নানি ভরণ-পোষণ লাভ করবে না। (আল বাহরুর রায়িক : ৪/২২৩; আল মাউনা আলা মাজহাবিল মালিক : ১/৯৩৯)

প্রথম মতামতের পক্ষে দলিল হলো, আল্লাহর বাণী—‘উত্তরাধিকারীরও অনুরূপ দায়িত্ব।’

(সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩৩)

অর্থাৎ যে যার কাছ থেকে উত্তরাধিকার লাভ করে, সে তার দায়িত্বও গ্রহণ করবে। আর পরোক্ষভাবে ব্যক্তি দাদা-দাদি ও নানা-নানির উত্তরাধিকার লাভ করে থাকে।

(আল মুগনি : ৮/২১৩)

সৎ মা ও বাবার ভরণ-পোষণ দেওয়া ব্যক্তির জন্য আবশ্যক নয়। যদি ব্যক্তির সামর্থ্য থাকে, পিতা সামর্থহীন হন বা মারা যান এবং সৎ মাও নিরুপায় হন তবে আত্মীয় হিসেবে তারকে খরচ দেওয়া মুস্তাহাব।

ভরণ-পোষণ দ্বারা উদ্দেশ্য

ভরণ-পোষণ দ্বারা সাধারণত প্রয়োজনীয় খরচ বা ব্যয় নির্বাহ করাকে বোঝায়। হানাফি মাজহাব অনুসারে নফকা তথা ভরণ-পোষণ বলতে মানুষের এমন প্রয়োজনকে বোঝায়, যার ওপর তার অস্তিত্ব নির্ভরশীল। সে হিসেবে ভরণ-পোষণ দ্বারা খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থান উদ্দেশ্য। (হাশিয়াতুল শালাবি : ৩/৫০; আল লুবাব ফি শরহিল কিতাব : ৩/৯০)

মালেকি মাজহাবে ভরণ-পোষণ দ্বারা উদ্দেশ্য অপচয় ছাড়া মর্যাদা ও অভ্যাস অনুসারে জীবন যাপন করতে যা কিছু প্রয়োজন হয়। (হাশিয়াতুদ দাসুকি : ২/৫০৯)

ফকিহ আলেমরা এ বিষয়েও একমত যে মা-বাবা সন্তানের কাছ থেকে তাদের প্রয়োজন অনুপাতে খরচ গ্রহণ করবে। তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেবে না। অন্যদিকে সন্তানও নিজের সামর্থ্য ও মা-বাবার প্রয়োজন বিবেচনা করে খরচ প্রদান করবে।

(বাদায়িউস সানায়ে : ৪/৩০)

চিকিৎসা, ঋণশোধ ও সেবক নিয়োগ

মা-বাবা অক্ষম হওয়ার পর খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের বাইরে আরো তিনটি প্রয়োজন সামনে আসে। তা হলো মা-বাবার চিকিৎসা করা, তাদের ঋণ পরিশোধ করা ও তাদের জন্য সেবক-সেবিকা নিয়োগ দেওয়া। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান হলো, সন্তানের জন্য মা-বাবার চিকিৎসার খরচ দেওয়া এবং আবশ্যক হলে সেবক নিয়োগ দেওয়া আবশ্যক। এই হিসেবে পিতার জীবদ্দশায় যদি তাঁর স্ত্রী (সত্মা) তাঁর সেবা করে, তবে সেই স্ত্রী বা সত্মায়ের ভরণ-পোষণও বহন করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৬২২; আল বাহরুর রায়িক : ৪/২২৪)

অন্যদিকে মা-বাবার ঋণ পরিশোধ করা সন্তানের জন্য ওয়াজিব নয়। সন্তানের সামর্থ্য থাকলে পরিশোধ করা উত্তম। কেননা হাদিসে মা-বাবার ঋণ পরিশোধ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। (ফাতহুল বারি : ৪/৭০)

স্ত্রী-সন্তান নাকি মা-বাবা?

ব্যক্তির জন্য স্ত্রী, সন্তান ও মা-বাবার ভরণ-পোষণ প্রদান করা আবশ্যক। প্রশ্ন হলো, ভরণ-পোষণ লাভের ক্ষেত্রে কারা অগ্রাধিকার পাবে? ‘আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু’ গ্রন্থে এই বিষয়ে লেখা হয়েছে, ‘যখন ভরণ-পোষণের হকদার একাধিক জন হয় এবং তাদের খরচ প্রদানের মতো নিকটাত্মীয় একজনই হয়, তখন ব্যক্তির সামর্থ্য থাকলে তার ওপর সবার জন্য ব্যয় করা ওয়াজিব। আর সে যদি সামর্থ্যবান না হয়, তবে সে নিজেকে দিয়ে শুরু করবে, অতঃপর তার ছোট, কন্যা ও অক্ষম সন্তান ভরণ-পোষণ পাবে। এরপর পাবে তার স্ত্রী।’

(আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু : ৭/৭৮৪)

এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ দরিদ্র হলে সে যেন তার নিজ হতে খরচ করা শুরু করে। তার পরও কিছু উদ্বৃত্ত থাকলে যেন স্বীয় পরিবারের লোকের জন্য খরচ করে। তার পরও কিছু থাকলে তা আত্মীয়-স্বজনের জন্য খরচ করে। তার পরও কিছু বাকি থাকলে এদিক-ওদিক দান করবে। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৬৫৩)

অবশ্য আলেমরা বলেন, ‘সন্তান অসচ্ছল হলে অভাবী ও অক্ষম মাতা-পিতাকে নিজের পরিবারে শামিল করে নেওয়া উচিত। কারণ গোটা পরিবারের খাদ্য বস্ত্রে দু-একজন শামিল করা অসম্ভব নয়।’ (আলমুফাসসাল : ১০/১৯৫)

আল্লাহ সবাইকে মা-বাবার উপযুক্ত সেবাযত্ন করার তাওফিক দিন। আমিন।,



banner close
banner close