বর্তমান সময়ে কুরবানির পশুর হাটে বিভিন্ন আলোচিত রাজনৈতিক নেতা বা সেলিব্রেটিদের নামে পশুর নামকরণ একটি আলোচিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। 'ট্রাম্প', 'মোদি', 'পুতিন' ইত্যাদি নামে পশুর পরিচিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালও হয়। অনেকেই এটিকে নিছক মজা মনে করলেও একজন মুসলিমের জন্য প্রশ্ন হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের নামকরণের বিধান কী?
কুরবানি যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, তাই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি আচরণ শরিয়তের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা জরুরি। কুরআন, হাদিস ও ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্যের আলোকে বিষয়টি আলোচনা করা যেতে পারে।
মূলত পশু-পাখির নাম রাখা শরিয়তে বৈধ। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও বিভিন্ন প্রাণীর নাম রেখেছিলেন। হাদিসে এসেছে, "রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি খচ্চর ছিল, যার নাম ছিল 'দুলদুল'। তাঁর একটি উটনী ছিল, যার নাম ছিল 'কাসওয়া'। তাঁর একটি ঘোড়া ছিল, যার নাম ছিল 'সাকব'।”
—ইবনে সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা; ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, "এ হাদিসগুলো দ্বারা প্রাণীর নাম রাখা বৈধ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।"
—শরহু সহিহ মুসলিম
অতএব, পশুর আলাদা নাম রাখা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং পরিচয়ের প্রয়োজনে এটি বৈধ।
এখানে মূল আলোচ্য বিষয় হলো, কোনো মানুষের নামে, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতা বা পরিচিত ব্যক্তির নামে পশুর নাম রাখা—এ বিষয়ে ইসলামের কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে।
১. ইসলাম মানুষের মর্যাদা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে :
আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।"
— সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৭০
তাফসিরবিদগণ বলেন, এ আয়াতে মানবজাতির বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, "আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান, ভাষা, আকৃতি ও মর্যাদার মাধ্যমে অন্যান্য সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।"
—তাফসিরুল কুরতুবী (১০/২৯৩)
সুতরাং, মানুষের নাম পশুর সাথে এমনভাবে জড়ানো, যাতে অপমান বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ধারণা তৈরি হয়, তা ইসলামের সম্মানবোধের পরিপন্থী।
২. বিদ্রূপ ও উপহাস ইসলামে হারাম :
আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। ... তোমরা একে অপরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না।"
—সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১১
ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, "এ আয়াত মানুষের প্রতি বিদ্রূপ, অপমান ও হেয় প্রতিপন্ন করার সকল পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ করেছে।"
—তাফসির ইবনে কাসির
অতএব, যদি 'ট্রাম্প', 'মোদি' বা 'পুতিন' নাম পশুর জন্য ব্যবহার করার উদ্দেশ্য হয় রাজনৈতিক বিদ্বেষ, ব্যঙ্গ বা কাউকে পশুর সাথে তুলনা করা, তাহলে তা নিঃসন্দেহে হারাম ও গুনাহের কাজ।
৩. মুসলিমের চরিত্র কুরুচিপূর্ণ হতে পারে না :
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "মুমিন ব্যক্তি গালি দেয় না, অভিশাপ করে না এবং অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ আচরণ করে না।"
—সুনানে তিরমিযী, হাদিস: ১৯৭৭
আরেক হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭
সুতরাং, এমন নামকরণ যদি কুরুচিপূর্ণ সামাজিক ট্রল, বিদ্বেষ বা অশালীন হাস্যরসের অংশ হয়, তবে তা একজন মুমিনের চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৪. কুরবানির ইবাদতের উদ্দেশ্য তাকওয়া :
আল্লাহ তাআলা বলেন, "আল্লাহর কাছে এগুলোর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।
সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৩৭
কুরবানি কোনো বিনোদন বা ভাইরাল সংস্কৃতির বিষয় নয়; এটি তাকওয়া, আনুগত্য ও ত্যাগের প্রতীক। কিন্তু যখন পশুর নামকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক হাস্যরস, ট্রল বা সামাজিক উসকানি তৈরি হয়, তখন ইবাদতের আধ্যাত্মিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুতরাং কুরবানির পশুর নাম 'ট্রাম্প', 'মোদি', 'পুতিন' ইত্যাদি রাখার বিধান মূলত উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভরশীল। যদি উদ্দেশ্য হয় বিদ্রূপ, অপমান বা কাউকে পশুর সাথে তুলনা করা, তাহলে তা শরিয়তে হারাম। আর যদি তা নিছক হাস্যরস বা ভাইরাল হওয়ার জন্যও করা হয়, তবুও তা মুসলিমের মার্জিত রুচি ও কুরবানির গাম্ভীর্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, তার কথা, আচরণ, রসবোধ ও সামাজিক সংস্কৃতি যেন তাকওয়া, শালীনতা ও সম্মানবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়। কুরবানির মতো মহান ইবাদতকে রাজনৈতিক বিদ্বেষ, ট্রল ও কুরুচিপূর্ণ সংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখাই ইসলামের সৌন্দর্য।
লেখক: মুফতী আব্দুর রহমান,
দাঈ ও ইসলামি কলামিস্ট
আরও পড়ুন:

.jpg)






