শনিবার

১৬ মে, ২০২৬ ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

জিলহজ্জের চাঁদ দেখা, চুল-নখ না কাটার সময় ও এর তাৎপর্য

মুফতী আব্দুর রহমান

প্রকাশিত: ১৫ মে, ২০২৬ ২৩:০৪

শেয়ার

জিলহজ্জের চাঁদ দেখা, চুল-নখ না কাটার সময় ও এর তাৎপর্য
ছবি সংগৃহীত

পবিত্র জিলহজ্জ মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি সময়। বিশেষ করে জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনকে ইসলামে বছরের শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। এ সময় ইবাদত, যিকির, রোজা, সদকা ও কুরবানীর গুরুত্ব অনেক বেশি।

এই সময় কুরবানীদাতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত হলো, জিলহজ্জের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে কুরবানী সম্পন্ন করা পর্যন্ত শরীরের চুল, নখ ও পশম না কাটা। বিষয়টি কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহবিদদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের ফজিলত

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

“শপথ ফজরের, এবং দশ রাতের।”

সূরা আল-ফাজর : ১-২

তাফসিরবিদদের একটি বড় অংশের মতে, এখানে “দশ রাত” বলতে জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে।

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,

“এমন কোনো দিন নেই, যেসব দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক প্রিয়।”

সহিহ বুখারি

চুল-নখ না কাটার সময় কখন থেকে?

জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ আমল শুরু হবে। অর্থাৎ যিলকদ মাসের শেষ দিনের সূর্যাস্তের পর থেকে কুরবানীর পশু জবাই করা পর্যন্ত কুরবানীদাতা ব্যক্তি চুল, দাড়ি-গোঁফ, হাত-পায়ের নখ, বগল ও নাভির নিচের পশম না কাটবেন।

তাই চাঁদ ওঠার আগেই প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা সম্পন্ন করে নেওয়া উত্তম।

উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন,

“তোমরা যখন জিলহজ্জের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা রাখে, তখন সে যেন তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।”

সহিহ মুসলিম

আরেক বর্ণনায় এসেছে,

“কুরবানী সম্পন্ন না করা পর্যন্ত সে যেন তার চুল ও চামড়ার কোনো অংশ স্পর্শ না করে।”

এই বিধান কার জন্য?

এ বিধান মূলত কুরবানীদাতার জন্য। অর্থাৎ যার নামে কুরবানী আদায় হবে বা যিনি কুরবানীর দায়িত্বে থাকবেন, তার জন্য এ আমল সুন্নাত।

পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক নয়। তবে চাইলে তারাও নফল হিসেবে এ আমল করতে পারেন।

কুরবানী দিতে না পারলেও কি এ আমল করা যাবে?

হ্যাঁ, অনেক আলেমের মতে কুরবানী দিতে অক্ষম ব্যক্তিও এ আমল করলে সওয়াবের আশা করতে পারেন। কিছু বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরবানী দিতে অক্ষম এক সাহাবীকে জিলহজ্জের দশ দিন চুল-নখ না কাটার পরামর্শ দেন। যদিও এ বর্ণনার সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, তবুও ফজিলতের দিক থেকে বহু আলেম এটি উল্লেখ করেছেন।

এ আমলের হিকমত ও তাৎপর্য

১. হাজীদের সঙ্গে সাদৃশ্য

হজ পালনকারীরা ইহরাম অবস্থায় চুল-নখ কাটেন না। যারা হজে যেতে পারেননি, তাদের জন্যও আল্লাহ তাআলা এক ধরনের আধ্যাত্মিক অংশগ্রহণের সুযোগ রেখেছেন।

এটি আল্লাহর সামনে বিনয় ও আত্মসমর্পণের প্রতীক।

২. তাকওয়া ও আনুগত্যের প্রকাশ

কুরবানী কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি আত্মত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর আনুগত্যের প্রতীক।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

“আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”

সূরা আল-হাজ্জ : ৩৭

চুল-নখ না কাটা সেই তাকওয়া ও আনুগত্যেরই একটি বাহ্যিক প্রকাশ।

ভুলে কেটে ফেললে কী হবে?

যদি কেউ ভুলে, না জেনে বা অসাবধানতাবশত চুল বা নখ কেটে ফেলেন, তাহলে কোনো গুনাহ বা কাফফারা নেই এবং কুরবানীও সহিহ হবে। তবে মনে পড়ার পর বাকি সময় এ আমল অব্যাহত রাখবেন এবং ইস্তিগফার করবেন।

তবে চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন, নখ ভেঙে কষ্ট দেওয়া বা ক্ষতের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী কাটা জায়েজ। ইসলামে কষ্ট দূর করার নীতি রয়েছে।

জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিশেষ সময়। এ সময়ে চুল-নখ না কাটার আমলটি বাহ্যিকভাবে ছোট মনে হলেও এর মধ্যে রয়েছে সুন্নাতের অনুসরণ, তাকওয়া এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার গভীর প্রকাশ।

লেখক: মুফতী আব্দুর রহমান



banner close
banner close