প্রতি বছর রমজানের শেষ দশ দিন আল-আকসার চত্বরে তাঁবু খাটিয়ে ইতিকাফ করা ছিল ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আল-আকসা মসজিদ অবরুদ্ধ।ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের জেরে ঘোষিত জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে এবার সেই আমেজ কেড়ে নেয়া হয়েছে। জর্ডান পরিচালিত ওয়াকফ কমিটির কর্তৃত্বে নগ্ন হস্তক্ষেপ করে মুসল্লিদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে দখলদার বাহিনী।
২৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি তরুণী শায়মা আবেদ জানান, গত ৫ বছর ধরে তিনি আল-আকসায় ইতিকাফ করছেন। সেখানকার আধ্যাত্মিক পরিবেশ তাকে বারবার টেনে নিয়ে যেত।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আল-আকসা ছিল আমাদের এক মিলনমেলা। জেরুজালেম, পশ্চিম তীর কিংবা তুরস্ক-ইন্দোনেশিয়ার মতো দূরদেশ থেকে আসা মুসলিমদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হতো এখানে। লাইলাতুল কদরের সেই রাতে মানুষের যে জনসমুদ্র দেখা যেত, তা আজ শুধুই কল্পনা।
২১ বছর বয়সী তায়মা আবু লায়লার কষ্ট ভিন্ন জায়গায়। তিনি বলছিলেন, শুধু যে এবারই ইতিকাফ করতে পারছি না তা নয়, ২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধের পর থেকেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলে দেয়া হয়েছে। আগে যেখানে ইবাদতে প্রশান্তি ছিল, এখন সেখানে প্রতিটি কোণ অস্ত্রধারী সেনায় ঘেরা। ইবাদত করার সময়ও মানুষকে ভয়ে থাকতে হয় কখন কোন পাশ থেকে দমন-পীড়ন শুরু হয়।
তায়মা বলেন, আল-আকসায় রমজানের শেষ দশক ছিল ‘পৃথিবীর জান্নাত’। কেউ তিলাওয়াত করছেন, কেউ কোনায় বসে রোনাজারি করছেন, আবার কেউ দলবেঁধে ইসলামের সুমহান আদর্শ নিয়ে আলোচনা করছেন। এই সবকিছু নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।
জেরুজালেমের রাস আল-আমুদ এলাকার বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী জোহদি আলিয়ান। তার ঘরের জানালা দিয়ে আল-আকসার সোনালি কুব্বাতুস সাখরা বা ডোম অব দ্য রক দেখা যায়। ২০০০ সাল থেকে তিনি নিয়মিত ইতিকাফ করছেন। আলিয়ান বলেন, আল-আকসা বন্ধের খবর আমার কাছে কোনো প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদের মতো মনে হয়েছে। আমরা এখন বাড়ির পাশের মসজিদে ইবাদত করি আর আল-আকসার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদি।
তিনি আরও বলেন, আল-আকসায় ইবাদত করা মানে আসমানের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা। সেখান থেকে আল্লাহর সঙ্গে যে গভীর সংযোগ অনুভব করতাম, তা আর কোথাও পাই না। আল-আকসাহীন রমজান কেবল কয়েকটি দিন অতিবাহিত করা ছাড়া আর কিছু নয়।
এবারের লাইলাতুল কদরে আল-আকসার সেই মায়াবী পরিবেশ নেই। সেহরির আগমুহূর্তের গুঞ্জন কিংবা ফজর পর্যন্ত সম্মিলিত কান্নার রোল—সবই আজ স্তব্ধ। বদ্ধ দুয়ারের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা লাখো ফিলিস্তিনির হৃদয়ে এখন একটাই হাহাকার—হে আল্লাহ, তোমার ঘর আমাদের জন্য আবারও খুলে দাও।
আরও পড়ুন:








