বুধবার

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৬ ফাল্গুন, ১৪৩২

আবু বকর (রা.) এর জীবন ও অবদান

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৫ ০০:০৬

আপডেট: ১৪ আগস্ট, ২০২৫ ০০:১১

শেয়ার

আবু বকর (রা.) এর জীবন ও অবদান
প্রতীকী ছবি

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাল্যকাল থেকে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও সর্বপ্রথম ঈমান আনা ব্যক্তি হলেন হজরত আবু বকর (রা.)। নবীজির (স.) মৃত্যুর পর মুসলমানদের নেতৃত্ব দেন তিনি। তাই তাকে প্রথম খলিফা বলা হয়।

তিনি মক্কার কোরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আবু কুহাফা ও মায়ের নাম সালমা বিনতে সাখার। নবীজির প্রতি দ্রুত ও অগাধ বিশ্বাস রাখার জন্য তাকে সিদ্দিক বা সত্যায়নকারী হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়।

প্রথম দিকে আবু বকর (রা.) একজন বণিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। ইয়েমেন থেকে বাণিজ্য শেষে ফেরার পর তিনি নবীজির (স.) ইসলাম প্রচারের সংবাদ পান। তারপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণ অন্য অনেকের ইসলাম গ্রহণের উৎসাহ জুগিয়েছে।

আবু বকরের পূর্ণ নাম আব্দুল্লাহ ইবনে উসমান ইবনে আমির ইবনে আমর ইবনে কাব ইবনে সাদ ইবনে তায়িম ইবনে মুররাহ ইবনে কাব ইবনে লুয়াই ইবনে গালিব ইবনে ফিহর আল কুরাইশি।

কোরআনে আবু বকরকে ‘গুহার দ্বিতীয় ব্যক্তি’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। হিজরতের সময় মুহাম্মাদের সঙ্গে সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নেওয়ার কারণে এভাবে সম্বোধন করা হয়েছে।

আবু বকর প্রথম যুগের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তিনি প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, অন্যান্য সবার ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাদের মনে কিছু মাত্রায় দ্বিধা ছিল; কিন্তু আবু বকর বিনা দ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

আবু বকরের ইসলাম গ্রহণ অনেককে ইসলাম গ্রহণে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহ জোগান। তার দ্বারা উৎসাহিত হয়ে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আবু বকর দাসদের প্রতি সদয় হয়ে অনেককে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দেন। আবু বকরের মুক্ত করা দাসরা অধিকাংশ নারী, বৃদ্ধ বা দুর্বল ব্যক্তি ছিল।

৬২৪ সালে আবু বকর মুসলিম ও কোরাইশদের মধ্যে সংঘটিত প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি রসুলুল্লাহ (সা.)-এর তাবুর প্রহরার দায়িত্বে ছিলেন। পরের বছর উহুদের যুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছেন। পরে আবু বকর ইহুদি বনু নাদির গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

৬২৭ সালে তিনি খন্দকের যুদ্ধ এবং পরবর্তী বনু কুরাইজা অভিযানে অংশ নিয়েছেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় মুহাম্মাদ (সা.) সৈনিকদের বেশ কয়েকটি দলে ভাগ করে একেক অংশ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি হজরত আবু বকরের তত্ত্বাবধানে ছিল।

শত্রুরা নানাভাবে পরিখা অতিক্রমের চেষ্টা করলেও আবু বকর তার দায়িত্বপ্রাপ্ত অংশে আক্রমণ ঠেকিয়ে দেন। তার নামে সে অংশে একটি মসজিদ নির্মিত হয়, যা মসজিদ-ই-সিদ্দিকি নামে পরিচিতি লাভ করে।

৬২৮ সালে তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি এ সন্ধির অন্যতম সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন। তিনি খায়বারের যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন।

৬৩০ সালে আবু বকর মক্কা বিজয়ে অংশ নেন। ৬৩০ সালে তিনি হুনায়নের যুদ্ধ এবং তাইফ অবরোধে অংশ নেন। হুনায়নের যুদ্ধের সময় মুসলিম সেনাবাহিনী হুনায়ন উপত্যকার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের তীরের সম্মুখীন হয়।

অপ্রস্তুত অবস্থায় হামলা হওয়ায় মুসলমানদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল। অনেকে ছোটাছুটি শুরু করলেও কয়েকজন সাহাবি নবীজি (স.)-কে রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন। হজরত আবু বকর তন্মধ্যে অন্যতম।

৬৩০ সালে তাবুক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে সহায়তার জন্য নবীজি (স.) মুসলমানদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়াতে বলেন। উসমান ইবনে আফফান এতে প্রায় নয়শ উট এবং একশ ঘোড়া দান করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব তার সম্পদের অর্ধেক দান করেন।

আবু বকর তার সব সম্পদ দান করে এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তার বক্তব্য ছিল, আমি আল্লাহ ও তার রসুলকে আমার ও আমার পরিবারের জন্য রেখেছি। ৬৩১ সালে মুসলমানদের একটি দল মুক্তভাবে হজের উদ্দেশে মক্কা গমন করে। আবু বকর এ দলের নেতৃত্ব দেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনি প্রথম আমিরুল হজ বা হজের নেতা হিসেবে স্বীকৃত।

বিদায় হজ থেকে ফেরার কিছুকাল পর মুহাম্মাদ (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় তিনি তার মৃত্যুর চার দিন আগ পর্যন্ত নামাজের ইমামতি করেছেন। এরপর অসুস্থতার মাত্রার কারণে ইমামতি করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি এ সময় আবু বকরকে নামাজের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন।

নবীজির (স.) মৃত্যু সংবাদ প্রচার হওয়ার পর উমর ইবনুল খাত্তাব অশান্ত হয়ে পড়েন এবং তা মানতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় আবু বকর বাইরে এসে ঘোষণা করেন, তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদের অনুসরণ করতে তারা জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে, অবশ্যই আল্লাহ সর্বদাই জীবিত থাকবেন কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। আবু বকরের বক্তব্যের পর উমরের অবস্থা শান্ত হয়।

আবু বকরের খিলাফত ২৭ মাস অর্থাৎ দুই বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী ছিল। এ সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তাকে বেশ কিছু অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হতে হয় এবং তিনি তা সফলভাবে মোকাবিলা করেন। নতুন নবী দাবিকারী বিদ্রোহীদের তিনি রিদ্দার যুদ্ধে দমন করেন। তিনি বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, যা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

এসব অভিযানের ফলে মুসলিম সাম্রাজ্য কয়েক দশকের মধ্যে শক্তিশালী হিসাবে আবির্ভূত হয়। আবু বকর সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে কোরআন সংকলন করেন। এর আগে কোরআনের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্নভাবে লিপিবদ্ধ ছিল। মৃত্যুর আগে আবু বকর (রা.) কোরআনের এ কপিটি তার উত্তরসূরি উমর ইবনুল খাত্তাবকে দিয়ে যান। উমর (রা.)-এর শাসনকালে এটি তার কাছেই রক্ষিত ছিল।

উমর কুরআনটি তার মেয়ে ও মুহাম্মাদ (সা.) এর স্ত্রী হাফসা বিনতে উমরকে দিয়ে যান। পরবর্তী খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রা.) এ কোরআনের আরও প্রতিলিপি তৈরি করিয়ে তা খেলাফতের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেছিলেন।

৬৩৪ সালের ২৩ আগস্ট আবু বকর (রা.) মারা যান। আয়েশা (রা.)- এর ঘরে মুহাম্মাদ (সা.)-এর পাশে তাকে দাফন করা হয়।



banner close
banner close