শুক্রবার

৬ নভেম্বর, ২০২৬ ২২ কার্তিক, ১৪৩৩

সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে ১১ দলের পাল্টা চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর, ২০২৬ ০৯:১৩

শেয়ার

সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে ১১ দলের পাল্টা চাপ
ছবি সংগৃহীত

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের বিরোধের মধ্যে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে ১৫ সদস্যের জাতীয় সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করেছে জোটটি। সংসদের ভেতরে বিরোধিতার পাশাপাশি সংসদের বাইরে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে তারা।

কমিটিতে জামায়াত, এনসিপি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি

১৫ সদস্যের এ কমিটিতে রয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, ১১-দলীয় ঐক্যের প্রধান সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এবং জুলাই শহীদ জাবের ইব্রাহিমের মা ও সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি।

কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায় জোটটি।

এ জন্য আইনজ্ঞ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা সভার পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের অংশীজনদের অভিজ্ঞতা ও মতামতও নেওয়া হবে।

সংসদের বাইরে জনমত গঠনে জোর

জামায়াতের শীর্ষ নেতারা বলছেন, শুধু সংসদে বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না ১১-দলীয় ঐক্য। রাজনৈতিক দলগুলোর গণ্ডি পেরিয়ে জুলাই আন্দোলনের অংশীজন, শহীদ পরিবার, আইনজ্ঞ ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জোটের লক্ষ্য, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিকে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা। এ জন্য সংসদের ভেতরে বিরোধী দলের ভূমিকার পাশাপাশি সংসদের বাইরে আলোচনা, জনমত গঠন ও রাজপথের কর্মসূচি সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সেই রায় বাস্তবায়নে সংসদের ভেতরে ও বাইরে উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন কমিটি বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বসবে। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও সংলাপের পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচিও পরিচালনা করবে।

জোটের প্রধান সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংস্কারের বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে তথ্যভিত্তিক ও যৌক্তিক উপায়ে জাতির সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। এ উদ্যোগ আগামী দিনের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও বেগবান করবে।

সরকারের বিশেষ কমিটির কার্যক্রম বর্জন ছাত্রসংগঠনগুলোর

এদিকে সরকারের গঠিত সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির কার্যক্রম বর্জন করেছে ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধি, ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলো।

বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের কথা থাকলেও বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি পদে সদস্য মনোনয়ন না দেওয়ায় বর্তমানে কমিটির সদস্য ১২ জন।

সরকার এ কমিটির মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের মতামত নিয়ে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে শুরু থেকেই এ প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে জামায়াত ও এনসিপিসহ বিরোধী জোটের দলগুলো।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়েই মূল বিরোধ

সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে বাস্তবায়নের পদ্ধতি। জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত।

নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ার পর বিরোধী জোটের দাবি, জনগণের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। তাদের বক্তব্য, গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শুধু সংসদীয় সংশোধন কমিটির মাধ্যমে এগোলে তা গণরায়ের যথাযথ প্রতিফলন হবে না।

ছাত্রসংগঠনগুলোর বর্জনে বেড়েছে বিরোধ

গত ৩ নভেম্বর সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির উদ্যোগে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ, ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ একাধিক সংগঠন সভায় অংশ নেয়নি। আমন্ত্রিত ৬২ জনের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ৩১ জন।

বর্জনকারী সংগঠনগুলোর আপত্তি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার, শুধু সংবিধানের কয়েকটি ধারা সংশোধন নয়। গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়ের ভিত্তিতে সংস্কার পরিষদ গঠন না করে সংশোধন কমিটির মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করে তারা।

ফলে সরকারের উদ্যোগে ছাত্রসমাজের উল্লেখযোগ্য একটি অংশের অনুপস্থিতি সংস্কার প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সংসদ বর্জন ও রাজপথের কর্মসূচিও বিবেচনায়

দাবি আদায়ে সংসদীয় কার্যক্রম বর্জন, রাজপথে বড় সমাবেশ এবং ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে ১১-দলীয় ঐক্য। জোটের নেতারা বলছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।

এ বিষয়ে পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণে শিগগিরই জোটের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসবেন। তবে সংসদ বর্জনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।