বুধবার

৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২০ কার্তিক, ১৪৩৩

আমির হামজার প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে ইসিতে সাবেক ছাত্রদল নেতার আবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ১২:২৭

শেয়ার

আমির হামজার প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে ইসিতে সাবেক ছাত্রদল নেতার আবেদন
ছবি সংগৃহীত

কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা ও বাতিলের দাবি জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আবেদন করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা মো. সিরাজুল ইসলাম। আমির হামজার নির্বাচনি হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে সম্পদ, আয়-ব্যয় এবং আর্থিক তথ্যের একাধিক অসংগতি, তথ্য গোপন ও মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া আবেদনে ব্যাংক হিসাবের স্থিতি, ওয়াজ মাহফিল ও আদ-দ্বীন হাসপাতাল থেকে আয়, নগদ অর্থ, কৃষি ও আবাসিক সম্পত্তি, স্ত্রীর সম্পদ, গাড়ি, বাড়িভাড়া, পারিবারিক ব্যয় এবং নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

ব্যাংক হিসাবে ৬৮ লাখ টাকা থাকার অভিযোগ

আবেদনকারী সিরাজুল ইসলামের দাবি, ২০২৫ সালের ৩০ জুন আমির হামজার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬৮ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ টাকা জমা ছিল। অথচ সংশ্লিষ্ট আয়কর রিটার্নে ওই হিসাবে কোনো টাকা না থাকার তথ্য দেখানো হয়েছে।

আবেদনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কুষ্টিয়া শাখায় আমির হামজার একটি ব্যাংক হিসাবের নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। হিসাব নম্বরটি ২০৫০১৩৩০২০২৬২৭৪১৭। আবেদনকারীর অভিযোগ, ওই হিসাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনি হলফনামায় ব্যাংকের নাম ও হিসাব নম্বর উল্লেখ করা হয়নি।

ওয়াজ ও হাসপাতাল থেকে আয় গোপনের অভিযোগ

আবেদনে আমির হামজার আয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রতি জুমার নামাজে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এক লাখ টাকা সম্মানী পান তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে প্রতিবার তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা সম্মানী নেওয়ার অভিযোগ করেছেন আবেদনকারী।

তাঁর দাবি, এসব আয়ের তথ্য ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হলেও নির্বাচনি হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে তা উল্লেখ করা হয়নি। আয়কর রিটার্নে আমির হামজার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা। এর পুরোটাই হামজা এন্টারপ্রাইজের কাপড় ও বইয়ের ব্যবসা থেকে এসেছে বলে সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

নগদ অর্থের হিসাবেও দুই নথিতে পার্থক্য রয়েছে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে। নির্বাচনি হলফনামায় আমির হামজার নগদ অর্থ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা। অন্যদিকে আয়কর রিটার্নে এর পরিমাণ ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা। দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য ৩৬ লাখ টাকা।

স্ত্রীর সম্পদ ও জমির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন

আবেদনকারীর অভিযোগ, নির্বাচনি হলফনামায় স্ত্রী তামান্না সুলতানার আয়কর রিটার্নের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। স্ত্রীর কৃষিজমির পরিমাণ ও মূল্য নিয়েও দুই নথিতে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

আবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনি হলফনামায় তামান্না সুলতানার কৃষিজমির পরিমাণ ১২ কাঠা বা ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মূল্য দুই লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর আয়কর রিটার্নে জমির পরিমাণ ১২০ শতাংশ এবং মূল্য ১৭ লাখ টাকা উল্লেখ রয়েছে। এতে জমির পরিমাণে প্রায় ১০০ শতাংশ এবং মূল্যে ১৫ লাখ টাকার পার্থক্য রয়েছে বলে দাবি করেছেন আবেদনকারী।

এ ছাড়া দলিল নম্বর ৬৪৯৮/২০২৫-এর মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত একটি দলিলে ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ জমি কেনার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জমিটির মূল্য ছয় লাখ টাকা, যার মধ্যে স্ত্রীর অংশের মূল্য ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ টাকা। আবেদনকারীর অভিযোগ, এই জমির তথ্যও নির্বাচনি হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি।

কুষ্টিয়া শহরের রাহিনী মৌজায় আমির হামজার নামে একটি আবাসিক প্লট থাকার তথ্যও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ২৭৭৬ নম্বর দলিলমূলে কেনা ওই জমির পরিমাণ ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ। আবেদনকারীর হিসাবে জমিটির বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য ৬০ লাখ টাকা। তবে নির্বাচনি হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে এ সম্পত্তির তথ্য নেই বলে দাবি তাঁর।

বাড়িভাড়া, গাড়ি ও ভবনের তথ্য নিয়ে আপত্তি

বাড়িভাড়া থেকে আয়ের হিসাব নিয়েও অসংগতির অভিযোগ করেছেন সিরাজুল ইসলাম। নির্বাচনি হলফনামায় আমির হামজার স্ত্রীর বার্ষিক বাড়িভাড়া আয় দেখানো হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে আবেদনকারীর দাবি, বাড়িটি স্বামী-স্ত্রীর যৌথ মালিকানাধীন হলেও তাঁদের কারও আয়কর রিটার্নে এ আয় উল্লেখ করা হয়নি। বাড়িটির বিদ্যুৎ বিল ও হোল্ডিং ট্যাক্স শুধু আমির হামজার নামে রয়েছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমির হামজার ব্যবহৃত ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৯-১৭৫৭ নম্বরের একটি গাড়ির তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, গাড়িটি ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হস্তান্তর করা হয়। নির্বাচনি হলফনামায় এর মূল্য ২৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেখানো হলেও আয়কর রিটার্নে গাড়িটির তথ্য উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আবেদনকারী।

এ ছাড়া পাঁচতলা ভবন ও জমির সম্মিলিত মূল্য আনুমানিক ১ কোটি ৬৮ লাখ ৭৩ হাজার ১৮৩ টাকা দেখানোর বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, এই মূল্য প্রকৃত বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভবনটি স্ত্রী তামান্না সুলতানার সঙ্গে যৌথ মালিকানাধীন হলেও তাঁর আয়কর রিটার্নে এর তথ্য নেই।

আয়কর রিটার্নে ১১৬ দশমিক ৬৪ গ্রাম বা প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণের উল্লেখ থাকলেও নির্বাচনি হলফনামায় তা দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হলফনামার ৩(ক) ও ৩(গ) নম্বর ক্রমিকের তথ্যের মধ্যেও অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে দাবি করেছেন সিরাজুল ইসলাম।

নির্বাচনি ব্যয় ৭২ লাখ টাকা দেখানোর দাবি

নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাবেও নির্ধারিত সীমা অতিক্রমের অভিযোগ আনা হয়েছে। আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে নির্বাচনি ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩৪ লাখ টাকা। এর বাইরে ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব থেকে আরও ৩৮ লাখ টাকা নগদ উত্তোলন করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

সব মিলিয়ে নির্বাচনি ব্যয়ের পরিমাণ ৭২ লাখ টাকা বলে দাবি করেছেন আবেদনকারী। তাঁর অভিযোগ, এই ব্যয় প্রার্থীর জন্য নির্ধারিত নির্বাচনি ব্যয়সীমার চেয়ে বেশি।

পারিবারিক ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নির্বাচনি হলফনামায় আমির হামজার বার্ষিক পারিবারিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬০ টাকা। তবে ড্রাইভারের বেতন, ইউটিলিটি বিল ও সন্তানদের শিক্ষাব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কি না, তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন আবেদনকারী। তাঁর দাবি, হলফনামায় দুই সন্তানের পড়াশোনার কথা উল্লেখ থাকলেও আয়কর রিটার্নে শিক্ষাব্যয় শূন্য দেখানো হয়েছে।

তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

আবেদনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২(৩খ) ধারা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীর পেশা, ব্যবসা, আয়ের সম্ভাব্য উৎস, নিজের ও নির্ভরশীলদের সম্পদ ও দায় এবং ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের তথ্য হলফনামাসহ দাখিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এ ছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১(ক) ধারার ক্ষমতাবলে অভিযোগগুলো তদন্তের দাবি জানিয়েছেন আবেদনকারী। তাঁর আবেদনে বলা হয়েছে, কোনো নির্বাচিত প্রার্থীর হলফনামা বা আয়-ব্যয়ের বিবরণীতে অসংগতি কিংবা মিথ্যা তথ্যের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন অবগত হলে প্রার্থীকে শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ৯১(খ) ধারা অনুযায়ী লিখিত আদেশে প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা এবং নির্বাচন বাতিল করে সংশ্লিষ্ট আসনে পুনর্নির্বাচনের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

অভিযোগ যাচাইয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল, বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, যানবাহন নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এবং ভূমি ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নথিপত্র পরীক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম। প্রয়োজনে মূল দলিলপত্র উপস্থাপন এবং তদন্তে কমিশনকে সহযোগিতা করার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন তিনি।

আবেদনের সঙ্গে আমির হামজার নির্বাচনি হলফনামা, প্রাসঙ্গিক আয়কর রিটার্ন, স্ত্রী তামান্না সুলতানার টিআইএন সনদ ও আয়কর রিটার্ন, নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী, গাড়ির নিবন্ধন ও হস্তান্তরসংক্রান্ত দলিলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

আবেদনকারী অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও শুনানি শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা, নির্বাচন বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

মো. সিরাজুল ইসলাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম আব্দালপুর এলাকার মরহুম আলী হোসেনের ছেলে। তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং ২০০৯-১০ মেয়াদে ইবি ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।