জাতীয় নির্বাচনের আগে জোটবদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দূরত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লং মার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী নিয়ে দুই দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, জোটে কি ভাঙনের সুর বাজছে?
দুই দলের নেতারা অবশ্য জোট ভাঙার সম্ভাবনা নাকচ করছেন। তাঁদের বক্তব্য, ১১ দলীয় ঐক্য বহাল রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়া, মেয়র প্রার্থী নির্ধারণ এবং জোটের সমর্থন নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে দুই দলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, নাকি নির্বাচনের আগে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে দরকষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করছে এনসিপি, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।
সিটি নির্বাচনে প্রার্থী নিয়ে মতবিরোধ
জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে দূরত্বের অন্যতম কারণ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী। গত ১৩ সেপ্টেম্বর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে জামায়াত ঢাকা উত্তরে দলটির উত্তরাঞ্চলের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে একই জোটের দুই দল রাজধানীর দুই সিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এনসিপির একাধিক সূত্রের দাবি, ঢাকার অন্তত একটি সিটিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনে জোটের সমর্থন চায় দলটি। তবে জামায়াত দুই সিটিতেই নিজেদের প্রার্থী রাখার সিদ্ধান্তে অনড়। অন্য সিটি করপোরেশনগুলোতেও নিজস্ব প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে দলটির।
এ পরিস্থিতিতে সমঝোতা না হলে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে এনসিপি। নির্বাচনে ফলাফল যা-ই হোক, নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন যাচাই করতে চায় দলটি। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হলে এ অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লং মার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি
১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লং মার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি দুই দলের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনসহ শীর্ষ নেতাদের কাউকে দেখা যায়নি।
আগের দুটি লং মার্চে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও এবার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। পরে দলটির কয়েকজন নেতা লং মার্চের বহরে যোগ দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এবং রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ।
এর আগের দিন শুক্রবার ঢাকার শাহবাগে সমাবেশ করে এনসিপি। সেখানে নাহিদ ইসলাম স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান জানান এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম ঘোষণা করেন।
এনসিপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় পরিচয় ও নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি তুলে ধরতে চান তাঁরা। এ কারণে ১১ দলীয় ঐক্যে থাকলেও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন কর্মসূচিতে আগের মতো সক্রিয় অংশগ্রহণ না করার বিষয়ে দলের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে। নিজেদের কর্মসূচিতেও জামায়াতের সাংগঠনিক সহযোগিতা না নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
জামায়াত ও এনসিপির নেতাদের বক্তব্যেও মতপার্থক্যের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। শাহবাগের সমাবেশে আসিফ মাহমুদ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের পর জামায়াতের প্রার্থীর আচরণের সমালোচনা করেন। নির্বাচন নিয়ে আপসকামিতার প্রশ্নও তোলেন তিনি। ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচন ঘিরে জামায়াতের অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে মিষ্টিমুখের ঘটনা নিয়ে এনসিপির অবস্থান দুই দলের রাজনৈতিক বক্তব্যে নতুন মাত্রা যোগ করে।
যশোরে লং মার্চের পথসভায় এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, বিরোধী দলকে বিকল্প সরকার হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। নির্বাচনে কারচুপি হলে তা স্পষ্টভাবে বলতে হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, একদিকে ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলা, অন্যদিকে মিষ্টিমুখ করে আসা—এ ধরনের অবস্থান বিরোধী রাজনীতি হতে পারে না।
এর জবাবে কুষ্টিয়ায় লং মার্চের সমাপনী সমাবেশে আবু সাদিক কায়েম বলেন, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যাঁদের ছাত্র উপদেষ্টা করা হয়েছিল, তাঁদের ব্যর্থতার কারণেই এখন গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ নিয়ে আন্দোলন করতে হচ্ছে। এ দায় তাঁদেরও রয়েছে।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের প্রশ্নে জামায়াতের অনড় অবস্থানের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা, সংস্কার প্রক্রিয়া এবং সাবেক ছাত্র উপদেষ্টাদের দায়িত্ব পালন নিয়েও সমালোচনা ছিল। এতে দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া আরও দৃশ্যমান হয়।
জোট ভাঙার আশঙ্কা নাকচ এনসিপির
লং মার্চে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিকে জোটের দূরত্বের ফল হিসেবে দেখতে নারাজ এনসিপির কয়েকজন নেতা। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের তিনজনসহ অনেকে লং মার্চে অংশ নিয়েছেন। ব্যস্ততা, দিনের কর্মসূচি এবং রাতে সমন্বয় সভা থাকায় কয়েকজন নেতা সকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেননি। তাঁর দাবি, জোট ভাঙার মতো কোনো বিষয় নেই।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদও একই অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জোট ভাঙছে বা তাঁরা জোট ছাড়ছেন, বিষয়টি এমন নয়। দলের প্রধান ব্যস্ততার কারণে লং মার্চে আসতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, আগে তাঁদের রাজনৈতিক পর্ষদের ১৬ জনের মধ্যে আটজন লং মার্চে অংশ নিতেন, এবার এসেছেন চারজন। আগেও তিনি অংশ নিতে পারেননি, এবার অন্য কেউ আসতে পারেননি। তাঁরা নিজেদের কর্মসূচি পালন করছেন, একই সঙ্গে ১১ দলীয় জোটের সঙ্গেও রয়েছেন।
তবে এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই জামায়াতের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থী ঘোষণা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। সেই কারণেই লং মার্চে শীর্ষ নেতাদের অনেকে অংশ নেননি বলে তাঁর দাবি। তবে আপাতত জোট ভাঙার সম্ভাবনা নেই বলেও জানান তিনি।
এনসিপির নেতৃস্থানীয় আরেক নেতা বলেন, জামায়াতকে একটি বার্তা দিতেই লং মার্চের আগের দিন ও পরের দিন দলের বড় দুটি কর্মসূচি রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেও জোটের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কিছুটা কমানো হয়েছে।
জামায়াতের অবস্থান কী
জামায়াতের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা সিটিতে প্রার্থী নিয়ে এনসিপি কিছুটা নাখোশ বলে মনে হয়েছে। দলটি নিজেদের কৌশল ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে। লং মার্চে আগের মতো উপস্থিতি না থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং জামায়াতের শীর্ষ নেতারাও তা জানেন। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব দল এককভাবে অংশ নিক, এমনটাই চায় জামায়াত।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য অটুট রয়েছে এবং তাঁরা একসঙ্গে আন্দোলন করছেন। তবে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আপাতত এককভাবে অংশ নেওয়ার দিকে রয়েছেন তাঁরা।
এর আগে লং মার্চের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তাঁদের মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই। ১১ দলীয় ঐক্য যে লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছে, সেই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঐক্য অটুট থাকবে।
দুই দলের নেতারা প্রকাশ্যে জোট অটুট থাকার কথা বললেও মেয়র প্রার্থী ঘোষণা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা এবং লং মার্চে অংশগ্রহণ নিয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এসব মতবিরোধ শেষ পর্যন্ত জোটের সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হয় কি না, তার ওপর।
আরও পড়ুন:







