ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর গ্রেপ্তার ও রিমান্ড নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ভিডিওটিকে ভুয়া ও সম্পাদিত দাবি করে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এক নারীর সঙ্গে ভিডিও কলে আবদুল আজিজকে অশ্লীল কথাবার্তা বলতে ও বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা যায়। কলের অপর প্রান্তে থাকা নারীকে তাঁর কথাবার্তা ও অঙ্গভঙ্গিতে সঙ্গ দিতে দেখা যায়। তবে ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সম্পাদিত। রাজনৈতিকভাবে তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করতে প্রতিপক্ষ ও শত্রুপক্ষ সুপরিকল্পিতভাবে এআইয়ের মাধ্যমে ভিডিওটি তৈরি করেছে।
ছেলের গ্রেপ্তার নিয়ে যা বললেন এমপি আজিজ
ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় নিজের ছেলের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে আবদুল আজিজ বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে তাঁর ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে শাকিল কাউকে চিনতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হেলমেট পরা ব্যক্তিরা শাকিলের ওপর হামলা করেছিলেন।
আবদুল আজিজ আরও বলেন, শাকিল চিকিৎসাধীন থাকার সময় তিনি সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিয়েছেন এবং চিকিৎসার জন্য টাকাও দিয়েছেন। শাকিলের বাবাও এ বিষয়ে তাঁর ছেলের কোনো দায় নেই বলে স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এর আগে শাকিল হত্যা মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এদিকে শাকিলের জানাজায় বক্তব্য দিতে গিয়ে উপস্থিত মুসল্লি ও নেতাকর্মীদের একাংশের ভুয়া ভুয়া স্লোগানের মুখে পড়েন সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুরুদাসপুরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
জানা জায় স্লোগান, ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে গুরুদাসপুর উপজেলার শহীদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজ মাঠে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলামের জানাজার আগে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। এ সময় তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে কথা বলতে শুরু করলে নেতাকর্মী ও মুসল্লিদের একাংশ ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
এ সময় মাইকে আবদুল আজিজ বলেন, তাঁর ছেলে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলেও তিনি ছেলের পাশে নয়, শাকিলের পাশেই থাকবেন।
পরে জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ছাত্রদলের রাজনীতি করেই তিনি আজকের অবস্থানে এসেছেন। তাই ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যার বিচার হবেই।
পরে নিহত শাকিলের পরিবারকে নিজের পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেন এমপি আজিজ। তবে এ ঘোষণার পরও সেখানে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন হুইপ দুলু।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ
জানাজা শেষে রাত ১১টার দিকে মুসল্লিদের একটি অংশ মিছিল নিয়ে চাঁচকৈড় বাজারে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে আমেরিকাপ্রবাসী রাসেলের মালিকানাধীন রাশ আরবান স্টাইল নামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের কেউ কেউ দোকান থেকে মালামাল নিয়ে যেতে দেখেছেন বলেও জানান। তবে এ ঘটনায় কারা জড়িত এবং কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তিন দিনের রিমান্ডে নুরুজ্জামান মিন্টু
ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে তাঁকে নাটোর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমীর হোসেন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক মাহমুদুল হাসান তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে সোমবার রাত ১টার দিকে গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবাড়িষা এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে মিন্টুকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম জানান, শাকিল হত্যা মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গুরুদাসপুর আমলি আদালতে হাজির করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
যুবদল থেকে বহিষ্কার মিন্টু
শাকিল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহিষ্কৃত ব্যক্তির কোনো অপকর্মের দায় দল নেবে না। একই সঙ্গে যুবদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে তাঁর সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে হত্যা করা হয় শাকিলকে
স্থানীয় ও থানা সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে নূর একাডেমির সামনে হেলমেট পরা দুই যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। প্রাণ বাঁচাতে শাকিল দৌড় দিলে মোটরসাইকেলে করে তাঁকে ধাওয়া করা হয়।
একপর্যায়ে শহিদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তাঁকে ধরে চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর আহত শাকিলকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে।
১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার রাত ৮টার দিকে শাকিলের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা রবিউল করিম গত ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:





.jpg)

