বুধবার

২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩ কার্তিক, ১৪৩৩

ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও দক্ষিণখানে আওয়ামী দোসরদের ভূমিদস্যুতা

নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:১০

শেয়ার

ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও দক্ষিণখানে আওয়ামী দোসরদের ভূমিদস্যুতা
ছবি সংগৃহীত

ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও রাজধানীর দক্ষিণখানের আসকোনা ও কাওলা এলাকায় থামেনি ভূমিদস্যুদের তাণ্ডব। রাজউকের নকশা জালিয়াতি, অস্ত্রের মুখে জমি দখল, সীমানা প্রাচীর ভাঙচুর আর গভীর রাতে সশস্ত্র মহড়া, সব মিলিয়ে জিম্মি হয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি নিরীহ পরিবার।

ঘটনার সূত্রপাত

ঘটনা রাজধানীর দক্ষিণখান থানাধীন কাওলা কামরুন নাহার মসজিদ সংলগ্ন কাওলা মধ্যপাড়ার। ১৯৮৫ সালের দিকে স্থানীয় গফুর মিয়ার কাছ থেকে এই জমি কেনেন সিভিল এভিয়েশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক শেখ অহিদুজ্জামান ওরফে জামান শিক্ষক।

দীর্ঘদিন ধরে শান্তিতে বসবাস করলেও বিপত্তি ঘটে যখন পাশের প্লটে ১০ তলা বহুতল ভবন বায়াত আল সাবাহ নির্মাণ শুরু করেন ডেভেলপার ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেন ও হাজী আমিনুল ইসলাম।

নিয়মানুযায়ী ৬ ফুট রাস্তা থাকা সত্ত্বেও, রাজউককে অন্য প্ল্যান দেখিয়ে ১২ ফুট রাস্তা বানানোর পাঁয়তারা করে এই জাকির-আমিনুল চক্র। আর তাতেই লোভের দৃষ্টি পড়ে প্রয়াত শিক্ষক জামানের কেনা জমির ওপর। শুরু হয় তাদের উপর হুমকি দামকি। আর সেসময় বাধ্য হয়ে বুধবার (১৩ জানুয়ারি) ২০১৬ সালে দক্ষিণখান থানায় প্রথম সাধারণ ডায়েরি করেন জামান।

অভিযোগ রয়েছে, পূর্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগের পরিচয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করত এই জাকির চক্র। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আশ্রয় বদল করে তারা এখন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে।

একের পর এক হামলা ও হুমকি

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে নেতৃত্বহীন এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) ভুক্তভোগী শিক্ষক জামান ও প্রতিবেশী রফিকের সীমানা প্রাচীর প্রথম দফায় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় জাকির বাহিনী।

এরপর দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া প্রবীণ শিক্ষক জামান রবিবার (১৬ মার্চ) মারা যান। চার কন্যা সন্তান নিয়ে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ৫৭ বছর বয়সী স্ত্রী সেলিনা জামানের কাঁধে।

ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিক্ষকের মৃত্যুর পরও থেমে থাকেনি নির্যাতন। শুক্রবার (৪ এপ্রিল) জাকির, আমিনুল, শ্যামল, এনামুল, মোস্তাফিজুর রহমান, মনির, বাচ্চু ও লিলিহ পুরো চক্রটি আবারও হামলা চালায় এবং নির্মাণাধীন বাড়ির কাজ বন্ধ করে দেয়। এ সময় ক্যাডার শ্যামলের বিরুদ্ধে চুল ধরে জিহ্বা কেটে ফেলার হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।

এছাড়াও, বাড়ির কর্মরত ম্যানেজার, কন্ট্রাক্টর, দারোয়ান এবং লেবারদের প্রতিনিয়ত ভয় দেখানো হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে বাড়ির মালিককে।

আদালতের নোটিশ অমান্য করে হামলা

বারবার বাধার মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে আইনি লড়াইয়ে যান ভুক্তভোগীরা। শুক্রবার (২২ আগস্ট) দেওয়াল রক্ষার্থে পরিবারটি হাইকোর্টে আপিল করলে আদালত থেকে বিবাদী জাকির ও আমিনুলের নামে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি হয়।

আর আদালতের এই নোটিশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও জাকির হোসেনের নেতৃত্বে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ সময় ৩০ হাজার টাকা মূল্যের ৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর, দারোয়ানের ঘর ও দেওয়াল ভেঙে ৩ থেকে ৪ ফুট জায়গা জোরপূর্বক রাতে রাস্তা ঢালাই করে নেয় তারা। তবে কৌশলগত কারণে একটি ক্যামেরা অক্ষত থাকায় তাদের এই তাণ্ডবের দৃশ্য রেকর্ড হয়ে যায়।

পরদিন থানায় গেলে অভিযোগ গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করা হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। পরবর্তীতে মঙ্গলবার (১৬ সেপ্টেম্বর) অনলাইনে এবং রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) সরাসরি থানায় জিডি এবং মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাজউকে অভিযোগ দায়ের করা হয়।

আইনি পদক্ষেপের খবর পেয়ে থামেনি হুমকি। শুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাতে জাকির বাহিনীর আরেক সদস্য শামীম ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে নানা ভয়ভীতি দেখায়। সে সময় বাড়িতে কেবল ছোট মেয়ে উপস্থিত ছিলেন।

আর সর্বশেষ রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাজউক কিংবা ডেসকোর কোনো অনুমতি ছাড়াই প্রবীণ শিক্ষকের বাসার দেয়ালের পাশে গর্ত খুঁড়ে বিদ্যুতের পিলারের লাইন জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায় চক্রটি।

অবশেষে রবিবার (১২ অক্টোবর) রাজউকের কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এলে মূল অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম সবার সামনে স্বীকার করেন যে সীমানা প্রাচীর ভেঙে রাস্তা ঢালাই করে ভুল করেছেন তারা।

সবার চোখের সামনে এই তাণ্ডব চললেও, জাকির বাহিনীর পেশিশক্তির ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।

একাধিক পরিবার দিশেহারা

এই চক্রটির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, জামানের বাড়ির পূর্ব দিকের দেয়াল ভেঙে ৪ ফুট জমি দখলের পর, বর্তমানে পশ্চিম দিকেও একইভাবে জায়গা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ সিএস এবং আরএস জরিপে এই এলাকায় এই অতিরিক্ত রাস্তার কোনো অস্তিত্বই নেই। কেবল পেশিশক্তি আর রাজনৈতিক মদতেই একের পর এক সীমানা প্রাচীর ভেঙে এই ভূমি দখল চলছে।

জাকির বাহিনীর তাণ্ডব ও ভূমিদস্যুতার শিকার হয়ে নিঃস্ব হতে বসেছেন শিক্ষক জামান ও তাঁর পরিবার।

শুধু জামানের পরিবারই নয়, একই চক্রের দৌরাত্ম্যে এলাকার আরও ৩ থেকে ৪টি পরিবার চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছে। আক্রান্ত পরিবারগুলোর মধ্যে রফিক মোল্লার পরিবার অন্যতম। তার বসতবাড়ির সীমানা প্রাচীর ভেঙে ১ ফুট জায়গা জবরদখল করে নেয় তারা।

চক্রটির ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকিতে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী রফিকের পরিবার। তাদের ভয়ে প্রতিবাদ বা মুখ করতে সাহস পাচ্ছেন না খোদ ভুক্তভোগী রফিকের পরিবারও।

অন্যদিকে, স্থানীয় কাদের দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু তাঁর ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমিও এই চক্রটি জমির কাগজ ৯-৬ করে জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। আর আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তা অমান্য করে এক রাতে স্থাপনা নির্মাণ করে তারা এই দখল সম্পন্ন করে।

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত জাকির হোসেনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফইম উদ্দিন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন।

রাজউকের নকশা জালিয়াতি ও রাতের আঁধারে জায়গা দখলের মুখে দিশেহারা প্রবীণ শিক্ষক জামানের পরিবারসহ এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবার। ভূমিদস্যুতা রোধে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আর জবরদখল হওয়া ভিটেমাটি ফেরত পেতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের আকুল আবেদন ভুক্তভোগীদের।