নির্দলীয় পদ্ধতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আইনি উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলো আগাম প্রার্থী ঘোষণা ও প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট মহলে বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, একাধিক এলাকায় বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনিও জানিয়েছেন, তাদের দল থেকে স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়া হবে।
চিফ হুইপসহ বিএনপির একাধিক সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের প্রার্থীকে ভোট না দিলে কোনো ধরনের উন্নয়ন হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন অবস্থানে নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা।
প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে নির্বাচন কমিশনে উদ্বেগ
রাজনৈতিক দলগুলোর আগাম প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিভিন্ন দল থেকে প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি তাঁর জন্য চিন্তার এবং এতে তাঁর কপালে ভাঁজ পড়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন করবেই, এটি স্বাভাবিক বিষয়। নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। রাজনৈতিক দলগুলো কাকে সমর্থন দিল, তা কমিশন দেখতে যাবে না বলে জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি বগুড়ায় এক অনুষ্ঠানে সংবাদকর্মীদের বলেন, নতুন আইন অনুযায়ী নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও দলগুলো তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন দিতে পারে।
একই মত প্রকাশ করে এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও সমর্থন করার সুযোগ রয়েছে। একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া ও সমর্থন করার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
আইনের উদ্দেশ্য ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
রাজনৈতিক দলগুলোর এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বর্তমান পরিস্থিতিকে যেই লাউ সেই কদু বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো হয়তো আইনের আক্ষরিক প্রয়োগ সরাসরি ভাঙছে না। কিন্তু নির্দলীয় নির্বাচনের মূল অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য তারা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।
বদিউল আলম মজুমদারের মতে, দলীয় প্রতীক তুলে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনে দলীয় প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু প্রতীক ছাড়া দলীয়ভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা পুরোনো চর্চারই পুনরাবৃত্তি।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আব্দুল আলীমের মতে, আইনে অরাজনৈতিক নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা এবং নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে স্পষ্টতা না থাকায় দলগুলো সেই সুযোগ গ্রহণ করছে। আইন ও বিধিমালার ত্রুটির কারণেই মূলত এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচন নিয়ে পুরোনো বিতর্ক
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হতো না। পরে আওয়ামী লীগ সরকার তৃণমূলের এসব নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এর ফলে ২০১৫ সালে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া এবং প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব সংঘাতে শত শত মানুষের প্রাণহানি হয়। সে সময় স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ আইন সংশোধনের আগে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার পক্ষে থাকলেও ব্যাপক সংঘাত ও প্রাণহানির পর অনেকে দলীয় প্রতীককে এর জন্য দায়ী করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন স্থানীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে না করার সুপারিশ করে। ওই সময় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল নির্দলীয় প্রতীকে ভোটের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার অধ্যাদেশ জারি করে নির্দলীয় নির্বাচনের আইনি পথ সুগম করে। পরে বিএনপি সরকারে এসে সেই অধ্যাদেশ অনুমোদন করে।
আগামী বছরের জানুয়ারিতে শুরু ইউপি নির্বাচন
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী বছরের ২২ জানুয়ারি থেকে পাঁচ ধাপে দেশজুড়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর ধাপে ধাপে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ইউনিয়ন পরিষদ বাদে দেশের অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ভেঙে দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠান জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে যেসব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পালিয়ে গেছেন, সেসব ইউনিয়ন পরিষদের বেশিরভাগের কার্যক্রম প্রশাসনিক কর্মকর্তারা পরিচালনা করছেন।
আরও পড়ুন:







