শনিবার

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৯ কার্তিক, ১৪৩৩

আ.লীগ ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪৫

শেয়ার

আ.লীগ ইস্যুতে বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়েছে। সরকারপক্ষের দাবি, বিরোধী দলের ইন্ধনে আওয়ামী লীগ অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে তাদের চাপে রাখতে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দুই পক্ষের এমন অভিযোগের মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতি অব্যাহত থাকলে এর সুবিধা পেতে পারে বিতাড়িত আওয়ামী লীগ।

সরকারের দাবি, তাদের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তবে অভিযোগের পক্ষে অকাট্য কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষেরই অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ তুলে ধরা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।

দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনে পাশাপাশি থাকা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে পরস্পরের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা ও সখ্যের অভিযোগ তুলছে। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, নিষিদ্ধ দলটির সঙ্গে সত্যিই কোনো পক্ষের সমঝোতা হচ্ছে কি না, নাকি প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে আওয়ামী লীগ ইস্যু ব্যবহার করা হচ্ছে।

সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে

বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধান বিরোধী দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও জুলাই সনদ নিয়ে শুরু থেকেই টানাপোড়েন দেখা দেয়। জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে বিরোধী দল।

সরকারের মেয়াদ সাত মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বিরোধী দল লংমার্চ, বিভাগীয় সমাবেশসহ বিভিন্ন সরকারবিরোধী কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচি থেকে সরকার পতনের হুমকিও এসেছে। সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে আর সহযোগিতা করা হবে না বলে ঘোষণা দেন।

একই সময়ে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন হচ্ছে। সরকারি দলের অভিযোগ, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এসব কর্মসূচি পালিত হচ্ছে এবং এর পেছনে বিরোধী দলের ইন্ধন রয়েছে। আন্দোলন জোরদার করতে বিরোধী দল নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ, তাদের কোণঠাসা করতে সরকারি দলের লোকজনই আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একজোট হয়ে বিরোধী দলকে দমনের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ তাদের।

নির্বাচনের আগেও উঠেছিল সখ্যের অভিযোগ

বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির অভিযোগ আগেও উঠেছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দুই দলই নির্বাচনী সুবিধা পেতে আওয়ামী লীগকে কাছে টানার চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ প্রকাশিত হয়।

ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক নেতাকর্মীদের ছাড়াতে তদবিরের তথ্য সামনে আসে। বিভিন্ন এলাকার নির্বাচনী জনসভায় জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাও দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জয় বাংলা স্লোগানও শোনা যায়।

নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের তুলনায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্য বেশি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনের পর দেশের কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার খবর পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে এসব কার্যালয় খোলা হয়। পরে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ও জুলাই বিপ্লবীরা কয়েকটি কার্যালয় ভাঙচুর করে তালাবদ্ধ করে দেন।

বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন কারাবন্দি নেতাকর্মী জামিনে মুক্তি পান। আত্মগোপনে থাকা দলটির নেতাকর্মীদের কেউ কেউ প্রকাশ্যেও আসতে শুরু করেন।

আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঘিরে বাড়তি নজরদারি

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর আত্মগোপনে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতা আবার আলোচনায় আসে। বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, কথিত লকডাউন কর্মসূচি, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের পাশাপাশি সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দলটির ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।

হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর সরকারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সারা দেশে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ডিসেম্বর পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে অর্থায়নের অভিযোগ

গত মঙ্গলবার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের প্রসঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জামায়াতকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার পর সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে বলে তাদের কাছে পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, একটি পক্ষ দেশের বাইরে থেকে অর্থ দিচ্ছে, আরেকটি পক্ষ দেশের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে গত বুধবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে।

শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সরকারের উচিত শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়া।

বিএনপির পাল্টা অভিযোগ

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী দলের সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে।

জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি অভিযোগ করেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও একটি গুপ্ত দল অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, পরাজিত শক্তি ও ওই দলের আচরণ এবং কথাবার্তায় মিল রয়েছে। অতীতের মতো এখনো তারা বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রমাণ প্রকাশের তাগিদ বিশ্লেষকদের

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলেছেন। তাই ওই তথ্যের প্রমাণ তুলে ধরে বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত। একই সঙ্গে বিরোধী দলেরও পাল্টা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার।

তিনি বলেন, দুই পক্ষের অভিযোগের সুযোগ নিয়ে পতিত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নতুন করে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের পথ খুঁজতে পারে। এতে সরকারের উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হবে এবং দেশ ও সরকার কোনো পক্ষই লাভবান হবে না।

এই শিক্ষাবিদের মতে, বড় দুই দলের অনৈক্যের সুযোগে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠলে তা কারও জন্য ভালো হবে না। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে উভয় পক্ষের উচিত পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহার করে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজল বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে কতটা গভীর ও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে দুই দলের পক্ষ থেকেই এ ধরনের বক্তব্য আসছে বলে তিনি মনে করেন।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, এভাবে দোষারোপের রাজনীতি চলতে থাকলে বিতাড়িত গোষ্ঠীই সুবিধা পাবে। এ বিষয়ে দুই পক্ষের এখনই সংযত হওয়া দরকার। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।