শুক্রবার

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৮ কার্তিক, ১৪৩৩

স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে নতুন জোট, ভাঙনের শঙ্কায় ১১ দলীয় ঐক্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:১৫

শেয়ার

স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে নতুন জোট, ভাঙনের শঙ্কায় ১১ দলীয় ঐক্য
ছবি সংগৃহীত

কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সাতটি ইসলামী রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নিচে আনতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় গঠিত হয়েছে সমমনা ইসলামী দলসমূহ নামে নতুন প্ল্যাটফর্ম। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়া এবং কওমি ধারার দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এ প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনে ঐকমত্য থাকলেও পুরোনো জোট ছাড়ার বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি জানিয়েছে, তারা এখনো ১১ দলীয় ঐক্যে রয়েছে। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বলছে, সাত দলের ঐক্য চূড়ান্ত হলে একাধিক জোটে থাকার সুযোগ নেই। বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশও জানিয়েছে, জামায়াতের জোটে থাকা দলগুলো সরে এলে তারা নিজেদের রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করবে। ফলে নতুন প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ কাঠামো ও দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় সাত দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। সাতটি দলের তিনজন করে প্রতিনিধি এবং হেফাজতের তিনজন নেতা এতে অংশ নেন।

বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আপাতত সাত দলের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক জোট ছাড়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

স্থানীয় নির্বাচনকে গুরুত্ব দিচ্ছে নতুন প্ল্যাটফর্ম

নতুন প্ল্যাটফর্মে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। প্রতিটি দলের তিনজন করে প্রতিনিধি নিয়ে ২১ সদস্যের লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার, অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। জাতীয় নির্বাচনে কওমি ধারার দলগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থান করলেও স্থানীয় নির্বাচনে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটের ভিত্তি কাজে লাগিয়ে একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায় তারা।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচনের আগে কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্য ছিল, নির্বাচনের পর তা ভেঙে যায়। সেই ঐক্য পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই তারা আবার একত্র হয়েছেন। তবে নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের অর্থ পুরোনো জোট ছেড়ে দেওয়া নয়।

তার ভাষ্য, এটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হবে, নাকি অরাজনৈতিক কাঠামোয় পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। আগামী ডিসেম্বরের বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। দেশ ও জাতির স্বার্থে সমমনা দলগুলো আবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, সাতটি দলই দেওবন্দের আদর্শের অনুসারী এবং সমমনা। সে কারণে প্রথম লক্ষ্য হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলোকে একত্র করে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়া।

তবে পুরোনো জোটে থেকে নতুন প্ল্যাটফর্মে কাজ করার বিষয়ে আপত্তি রয়েছে তার। গাজী আতাউর রহমানের মতে, প্রাথমিকভাবে জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত না হলেও শেষ পর্যন্ত অন্য জোট ছাড়তে হবে। একই সময়ে দুটি জোটে থাকার সুযোগ নেই। তার ভাষ্য, এমন অবস্থান নৈতিকতার সঙ্গে যায় না এবং হাস্যকর হবে। সাত দলের ঐক্য চূড়ান্ত হলে সবাই অন্য জোট ছেড়ে আসবে বলে আশাবাদী তিনি।

১১ দলীয় ঐক্য ছাড়ছে না দুই দল

নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের পরও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে থাকার অবস্থান বজায় রেখেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। এ অবস্থান নতুন প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ সমঝোতাকে জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার বলেন, তারা এখনো জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে রয়েছেন। জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে চলমান আন্দোলনেও নেজামে ইসলামের সমর্থন রয়েছে। জোট ছাড়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

১১ দলীয় ঐক্যের ডাকা আগামী ৩১ অক্টোবরের লংমার্চেও অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

বৈঠক-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, হেফাজতের পক্ষ থেকে জামায়াতের জোটে থাকা দলগুলোকে সেখান থেকে সরে আসার বিষয়ে আগে থেকেই চাপ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি ১১ দলীয় ঐক্য ছাড়লে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশও বিএনপির সঙ্গে থাকা রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে এগোতে পারে—এমন সমীকরণ নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে বৃহস্পতিবারের বৈঠকে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান বলেছেন, অন্য রাজনৈতিক জোটে থাকা দলগুলো সেসব জোট ছেড়ে সমমনা ইসলামী দলসমূহ প্ল্যাটফর্মে আসার ব্যাপারে একমত হয়েছে। আগামী ৫ ডিসেম্বর সাত দলের পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানান তিনি।

তবে তার বক্তব্যের সঙ্গে অন্য দলগুলোর নেতাদের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি এখনো ১১ দলীয় ঐক্যে থাকার কথা বলছে। ফলে পুরোনো জোট ছাড়ার বিষয়ে হেফাজতের দাবি অনুযায়ী ঐকমত্য তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি দলের প্রধানের দাবি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা আগে থেকেই ছিল। তার অনড় অবস্থানের কারণে এত দিন সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।

ওই নেতার ভাষ্য, মামুনুল হক রাজি হলে জমিয়তও বিএনপির সঙ্গে থাকা রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিতে পারত। এ বিষয়ে এখনো চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক শর্ত নিয়ে মতভেদ

নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনে হেফাজতে ইসলামের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, তারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন না; বরং কওমি ধারার দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় অভিভাবক বা মুরুব্বির ভূমিকা পালন করছেন।

হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মুহিউদ্দিন রাব্বানী জানান, কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। সেই ধারাবাহিকতায় সাত দলকে নিয়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছে। এটিকে হেফাজতের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে সাত দলের প্রতিনিধিদের একটি বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে সাত দলের ৩৫ প্রতিনিধি ও হেফাজতের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সাত দলের ঐক্যের জন্য একটি সাংগঠনিক কাঠামোর প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত কাঠামোয় সাত দলের কোনো একটি দল একক সিদ্ধান্তে অন্য কোনো ইসলামী বা অনৈসলামিক দলের সঙ্গে জোট করতে পারবে না—এমন শর্ত রাখা হয়েছিল। দেশ, জাতি ও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজনে সাত দলের মজলিসে শুরা ও উপদেষ্টা পরিষদের অনুমতি নিয়ে অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়।

একই সঙ্গে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদাবিরোধী বলে বিবেচিত কোনো দলের সভা-সমাবেশে জোটের নেতাদের অংশগ্রহণ না করার প্রস্তাবও ছিল।

তবে এসব শর্ত নিয়ে দলগুলোর মধ্যে আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত মজলিসের নেতাদের একাংশ মনে করেন, অন্য দলের সঙ্গে জোট করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় অনুমতির বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

কয়েকটি দল আকিদাসংক্রান্ত শর্তেরও বিরোধিতা করেছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে জামায়াতের আকিদা নিয়ে আপত্তি তুলে সংগঠনটির সঙ্গে রাজনৈতিক জোটে থাকা দলগুলোকে নতুন প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে শর্ত দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

১১ দলীয় ঐক্যে ভাঙনের চেষ্টা চলছে, অভিযোগ জামায়াতের

নতুন প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন জোটটির প্রধান সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।

তার অভিযোগ, সরকার ১১ দলীয় ঐক্য ভাঙতে চাইছে। জোট অটুট থাকলে আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ ও কর্মসূচিতে সাড়া বাড়ছে, যা সরকারকে চাপে ফেলছে। এ কারণে হেফাজতের ধর্মীয় মোর্চাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিভাজন তৈরির চেষ্টা চলছে বলে মনে করেন তিনি।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকার যতই চেষ্টা করুক না কেন, ১১ দলীয় ঐক্যের শরিকরা বুঝেশুনেই জোটে রয়েছেন।

নতুন প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়া হলেও পুরোনো জোট ছাড়ার প্রশ্নে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এখনো স্পষ্ট। আগামী ৫ ডিসেম্বরের বৈঠকে এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, তার ওপর সাত দলের ঐক্যের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ভর করবে।