বৃহস্পতিবার

২২ অক্টোবর, ২০২৬ ৭ কার্তিক, ১৪৩৩

পূজা মণ্ডপে রাজনৈতিক নেতারা ধর্মীয়ভাবে তীব্র সমালোচনা!

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:৪৬

শেয়ার

পূজা মণ্ডপে রাজনৈতিক নেতারা ধর্মীয়ভাবে তীব্র সমালোচনা!
ছবি সংগৃহীত

কোরআনের ভাষায়, শিরক বা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করাকে বলা হয়েছে মহা জুলুম। শুধু তাই নয়, পবিত্র কোরআনে মূর্তিপূজা ও আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কিছুর উপাসনা নিয়েও দেয়া হয়েছে কঠোর সতর্কবার্তা। ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাসে যেখানে মূর্তিপূজা সম্পূর্ণ হারাম, সেখানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং অন্যান্য ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দকেও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় অংশ নিতে দেখা যায়। এমনকি পূজার সমর্থনে বক্তব্য দেয়া, সনাতন ধর্মের দেবী দুর্গাকে নিয়ে প্রশংসা করেও বিতর্কের মুখে পড়েছে অনেকে।

শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানীর বক্তব্য ও বিতর্ক

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী দুর্গার প্রশংসা করেন। এ সময় অসুরদের দমন করতেই দেবী দুর্গার আগমন হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে, দুর্গাকে শুভ শক্তি বলেও নিজের বক্তব্যে উল্লেখ করেন এ্যানী। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। আর এই বিতর্কের মধ্যেই সামনে আসে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানীকে নিয়ে জৈনপুরী দরবার শরিফের পীর মুফতি এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর বিস্ফোরক বক্তব্য। আব্বাসীর দাবি, সনাতনী মতাদর্শে বিশ্বাসী কেউ মুসলিম হতে পারে না।

বিএনপির অন্যান্য নেতাদের অংশগ্রহণ

অপরদিকে, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানও সনাতন ধর্মকে একটি বিচিত্র ধর্ম বলে মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে, হিন্দুধর্মের সঙ্গে পৃথিবীর কোনো ধর্মের তুলনা হয় না বলেও দাবি করেন তিনি। এদিকে, বিএনপির সাবেক নেত্রী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার দুর্গাপূজায় অংশগ্রহণ ঘিরেও জন্ম নিয়েছে নানা সমালোচনা। সম্প্রতি একটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে দেবী দুর্গাকে প্রণাম করতেও দেখা যায় তাঁকে। এমনকি ঈদের চেয়েও পূজায় তাঁর বেশি আনন্দ হয়—এমন মন্তব্য করেও সমালোচিত হন রুমিন ফারহানা। এখানেই শেষ নয়। সরস্বতীর বাহনকে নিজের নির্বাচনী প্রতীক বলেও বক্তব্য দিতে দেখা যায় রুমিন ফারহানাকে।

জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের নেতৃবৃন্দ

শুধু বিএনপিই নয়, প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশের বৃহৎ ইসলামী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন নেতার বক্তব্য ও কার্যক্রম ঘিরেও। ২০২৫ সালের দুর্গাপূজায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির রোজা আর পূজাকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলে মন্তব্য করে দেশের ধর্মীয় অঙ্গনে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। এর আগে, জামায়াতে ইসলামীর আরেক কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যাপক মতিউর রহমানের মন্দিরে গীতা পাঠের দৃশ্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। পিছিয়ে নেই অন্যান্য ইসলামী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দরাও। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করীমের মন্দিরে অনুদান দেয়ার বক্তব্য ঘিরেও এর আগে তৈরি হয় নানা সমালোচনা। ইসলামী অঙ্গনের আরেক কেন্দ্রীয় মুখ মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব। যিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। ইতোপূর্বে হিন্দুদের দুর্গাপূজায় মুসলিমদের উপস্থিতির বিষয়ে তাঁকে অগ্নিঝরা বার্তা দিতে দেখা গেলেও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই ধর্মীয় নেতাকেই দুর্গাপূজার মণ্ডপে উপস্থিত হতে দেখা যায়। অপরদিকে, তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকেও একটি ভিডিওতে মন্দিরে বরণ করে নিতে দেখা যায়।

ধর্মীয় সতর্কবার্তা ও বিশ্লেষকদের মন্তব্য

এদিকে, মুসলমানদের মূর্তিপূজায় অংশগ্রহণের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে এসেছে কঠোর সতর্কবার্তা। রাজনৈতিক স্বার্থে পূজায় অংশ নেয়ার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেক। একই বক্তব্যে হিন্দুদের ওপর জুলুম না করলে তাঁদের ভোট এমনিতেই পাওয়া যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সেইসঙ্গে, মন্দিরে গেলে ঈমান থাকবে না বলেও তার বক্তব্য থেকে জানা যায়। সব মিলিয়ে ইসলামী-অনৈসলামী—বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাই দুর্গাপূজা এলেই রাজনৈতিক স্বার্থে যেন ভুলে যান নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও আদর্শিক অবস্থান। পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, শিরক ছাড়া অন্যান্য গুনাহ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করতে পারেন। এ ছাড়া সূরা লুকমানের ১৩ নম্বর আয়াত, সূরা আল-হাজ্জের ৭৩ নম্বর আয়াত এবং সূরা আল-মায়িদাহর ৭৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কিছুর উপাসনা ও মূর্তিপূজার বিষয়ে সতর্কবার্তা রয়েছে। যেখানে কোরআন-হাদিসের আলোকে মূর্তিপূজায় অংশগ্রহণ কিংবা পূজার সমর্থনে বক্তব্য দিলে ঈমানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়, সেখানে ইসলামি দলগুলোর নেতৃবৃন্দের মন্দিরে উপস্থিতি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের পূজায় অংশগ্রহণ ঘিরে দেশের ধর্মীয় অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে বলেই মনে করছে বিশ্লেষকরা।