মঙ্গলবার

২০ অক্টোবর, ২০২৬ ৫ কার্তিক, ১৪৩৩

আগে আওয়ামী লীগ যা করত, এখন বিএনপি তাই করছে: গোলাম পরওয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:৪০

শেয়ার

আগে আওয়ামী লীগ যা করত, এখন বিএনপি তাই করছে: গোলাম পরওয়ার
ছবি সংগৃহীত

সরকারের সাত মাসে সমন্বয়হীনতা, দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা এবং বিরোধী দলের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিএনপির সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, আগে আওয়ামী লীগ যা করত, এখন বিএনপি তাই করছে। আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদের পথ থেকে ফিরে আসার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বেলা ১২টায় রাজধানীতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার।

তিনি অভিযোগ করেন, সভা-সমাবেশ ও ওয়াজ মাহফিল করতে দেওয়া হচ্ছে না। লাখো ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে ঠেকাতে না পেরে ওয়াজ মাহফিলের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগও এ ধরনের কাজ করেছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজশাহীর সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদের পথ থেকে ফিরে আসা উচিত।

জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় নিয়ে অভিযোগ

বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামী জুলাইকে ধারণ করে না বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটিকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার। তাঁর দাবি, জামায়াতে ইসলামীই জুলাইকে ধারণ করে। সরকার জুলাইয়ের চেতনা ধারণ না করায় গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় লোক বসাচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সাংবিধানিক পদসহ সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও যুবদলের লোকদের বসানো হচ্ছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতসহ ১১ দল জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে জনগণের গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করছে। বিএনপি জুলাইকে ধারণ করে না বলেই গণভোটকে অস্বীকার করছে এবং তা বাস্তবায়নে টালবাহানা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের চেতনার বাইরে গিয়ে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি কর্মকমিশনেও হস্তক্ষেপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে পিএসসির চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যদের পদত্যাগের কথা বলা হচ্ছে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ২০২৪ সালের আন্দোলনে দলীয়করণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।

জুলাই আহতদের চিকিৎসা ও স্মৃতি সংরক্ষণ

গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাইয়ে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় জামায়াতের আমির পাশে ছিলেন। জামায়াতে ইসলামী নিজস্ব উদ্যোগে জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতি তুলে ধরা ও সংরক্ষণের জন্য বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় তিনটি বই প্রকাশ করেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের কোটি কোটি টাকার তহবিল থাকা সত্ত্বেও জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা বেতন পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে কর্মকর্তারা তাঁদের কাছে অভিযোগ করেছেন বলে জানান জামায়াতের এই নেতা।

সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিএনপির সমালোচনা

সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, দলটি নিজেদের নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে অনড় থেকে রাষ্ট্র সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যা ফ্যাসিবাদী। বিএনপি নিজেদের মতো বিশেষ কমিটি গঠন করে সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের পথে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, বিএনপি ভিন্নমত গ্রহণ করতে পারেনি এবং সমঝোতা করেনি। জামায়াতের পাঁচটি নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে তারা দৃঢ় অবস্থানে থাকেনি। বিএনপি রাষ্ট্রকাঠামোকে ফ্যাসিবাদী কায়দায় ধরে রাখতে নিজেদের নোট অব ডিসেন্টের ওপর অনড় রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সংবিধান সংস্কার না করে বর্তমান কাঠামো বজায় রাখা হলে যে প্রধানমন্ত্রীই ক্ষমতায় আসবেন, তিনিই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবেন।

সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের সহযোগিতা প্রয়োজন কেন, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, জনগণ গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট দিয়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সরকার সংস্কার না করে জনগণকে পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধন করতে চায়। সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকার অসত্য তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতাকে অসম্মানের অভিযোগ

ওসমানী উদ্যানে একটি অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেতার যোগদান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে বিরোধীদলীয় নেতার নাম উল্লেখ না করা অসম্মানজনক। অথচ প্রতিমন্ত্রীদের নাম আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখ করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, রুলস অব প্রেসিডেন্স অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতা পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদার অধিকারী। আমন্ত্রণপত্রে যথাযথ সম্মান না দেওয়ার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে যাননি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে অসত্য ও হাস্যকর আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানান গোলাম পরওয়ার।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারে দুর্নীতি ও দলীয়করণ নিয়ে কথা বললে বিরোধী দলকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে তুলে ধরা হয়। এভাবে একদলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ ও আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ তৈরি করা হচ্ছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধী দল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে জুলাইবিরোধী আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। নিজেদের দলীয়করণ ও ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা চলছে। জামায়াত ফ্যাসিস্টদের ফিরে আসার সুযোগ করে দিচ্ছে না; বরং বিরোধী দলের আন্দোলন উপেক্ষা করে সরকার অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ তৈরি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ফ্যাসিবাদের লক্ষণ হিসেবে দলীয়করণ ও গণরায় উপেক্ষার অভিযোগ

সরকার ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে দেখে ফ্যাসিবাদ চিনেছে। কিন্তু বিএনপির নেতা রুহুল কবির রিজভী সাত মাসেই তা ভুলে গেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ফ্যাসিবাদ চিনতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে। চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, সরকারি পদে দলীয় লোক বসানো এবং জনগণের রায় উপেক্ষা করা ফ্যাসিবাদের পথ। গণভোটের রায় না মানা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গণরায় উপেক্ষা করাও ফ্যাসিবাদের লক্ষণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নিজ দলের জুলাইয়ে আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বললেই বিএনপি ফ্যাসিবাদের পথ চিনতে পারবে বলে মন্তব্য করেন গোলাম পরওয়ার। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির বক্তব্যের সমালোচনা করে সেটিকেও ফ্যাসিবাদের পথ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

এ ছাড়া মাদরাসাগুলোর ব্যবস্থাপনা কমিটি একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভেঙে দেওয়ার সমালোচনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তাঁর অভিযোগ, দলীয় লোক বসানোর উদ্দেশ্যে সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ১৭ বছর শেখ হাসিনা এ পথেই হেঁটেছেন এবং পরে দিল্লি চলে গেছেন বলে রিজভীকে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কোনো জোট ছিল না বলে দাবি করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় ও বিশদলীয় জোট হয়েছিল। অন্যদিকে জামায়াতের প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা বাস্তবায়নের দাবিতে জাতীয় পার্টি, বাম দলসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে আন্দোলন করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, বিএনপির গণবিরোধী অবস্থানের কারণে দলটি ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বিএনপির কারণেই আওয়ামী লীগ ওই বছর ক্ষমতায় এসেছিল বলে দাবি করেন তিনি। সে সময় সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে জনগণ আন্দোলন করেছিল। বিএনপি মাগুরা মার্কা নির্বাচন করেছিল এবং ক্ষমতায় গিয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রশিবিরকে উৎখাত করেছিল বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেনি; জনগণের দাবি আদায়ের জন্য বিভিন্ন দলের সঙ্গে একত্রে আন্দোলন করেছে।

বিরোধী দলের এমপিদের বরাদ্দ না দেওয়ার অভিযোগ

সরকারের বরাদ্দ থেকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, অনির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ওপর দারোগাগিরি করতে বসানো হয়েছে। তাঁর মতে, এটিও ফ্যাসিবাদের পথ।

বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে ভবিষ্যতে অসত্য তথ্য জাতির সামনে তুলে না ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি সরকারের অসংলগ্ন আচরণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও মাওলানা আবদুল হালিম; সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মো. আব্দুর রব, অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও মোবারক হোসাইন; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি; কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান এবং মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার।