বৃহস্পতিবার

৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩ আশ্বিন, ১৪৩৩

ভবন দখলের অভিযোগ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হকের বিরুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:২১

শেয়ার

ভবন দখলের অভিযোগ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হকের বিরুদ্ধে
ছবি সংগৃহীত

বাংলার বাণী ভবন। রাজধানীর মতিঝিল মেট্রো স্টেশনের নিচেই, ব্যস্ত সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ৫৩ বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী চারতলা এই ভবনটি।

প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে তালা
সম্প্রতি দৈনিক মানবজমিন একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, ‘সেই আলোচিত ভবনটি এখন একজন প্রতিমন্ত্রীর কব্জায়’ শিরোনামে। সেখানে দাবি করা হয়, ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের পর কয়েক দফা দখলের মহড়া হলেও, বর্তমানে ভবনটির বেশির ভাগ অংশ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। আর এর মূল নেপথ্যে রয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।

জানা গেছে, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের নির্দেশেই ভবনের দু’টি ফ্লোর তালা মেরে আটকে রাখা হয়েছে। ভবনটির দেখভাল করছেন সারোয়ার হোসেন সানী নামের এক ব্যক্তি, যিনি এলাকায় নিজেকে নুরের আত্মীয় ও গণঅধিকার পরিষদের ব্যানারে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী হিসেবে পরিচয় দেন।

আর ভবনের পেছনের অংশে সম্প্রতি ‘পানসি’ নামে একটি খাবারের রেস্টুরেন্ট উদ্বোধন করা হয়েছে, যার মালিকানাতেও জড়িত গণঅধিকার পরিষদের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি।

তাপসের নামফলক নামানো
এদিকে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের কয়েকদিন আগেই দেশের বাইরে পালিয়ে যান, ভবনটির স্বত্বাধিকারী পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলে নূর তাপস। সরকারের পতনের পরপরই বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনটিতে হামলা চালিয়ে তাপসের বিশাল নামফলক টেনে নামায়।

গণ-অভ্যুত্থানের দু’দিন পর একদল দুর্বৃত্ত ভবনে ঢুকে ৩য় ও ৪থ তলায় থাকা, তাপসের ‘আইন চেম্বার’ ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে ব্যাপক লুটপাট চালায় বলেও জানা গেছে। তারা ভ্যান গাড়ি ভাড়া করে সেখান থেকে সমস্ত মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়।

এরপর ‘সমন্বয়ক’ পরিচয় দিয়ে কিছু তরুণ ভবনটি ‘ফ্যাসিবাদের প্রতীক’ ও ‘দখলমুক্ত’ করার ঘোষণা দিয়ে মহড়া দেয়। তারা ভবনে থাকা ব্যাংকের শাখায় গিয়ে ভাড়ার টাকা দাবি করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে সরে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীও চেষ্টার পর সরে দাঁড়ালে, শেষ পর্যন্ত হানা দেয় গণঅধিকার পরিষদের নেতারা।

ব্যাংকের ভাড়া আদায়ের চেষ্টা
২০০২ সাল থেকে মূল মালিকের সঙ্গে চুক্তি করে ভবনের ১ম ও ২য় তলায় কার্যক্রম চালাচ্ছে একটি বেসরকারি ব্যাংক। অভিযোগ উঠেছে, নুরুল হক নুরের পরিচয় দিয়ে যখন ভবনের দখল নেয়া হয়, তখনও তাদের কাছে ভাড়ার টাকা চাওয়া হয় এবং ভাড়া না দিলে শাখা সরিয়ে নেয়ার হুমকিও দেয়া হয়।

কিন্তু, বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এবং মূল মালিকের চুক্তি বলবৎ থাকায় ব্যাংক অনড় থেকে যায়। ৫ই আগস্টের পর ব্যাংকটিতেও লুটপাটের চেষ্টা হলেও কর্মীদের তৎপরতায় তা ব্যর্থ হয়।

পূর্বে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উল্টো পাশে ভবনের পেছনের অংশে ফাঁকা জায়গা ছিল, যেখানে আমের মৌসুমে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস আম মজুত রাখতো। অথচ এখন নিচতলায় সচল হয়েছে ‘পানসি’ রেস্টুরেন্ট এবং দোতলায় একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট করার কাজ চলছে।

ভবনের নাটকীয় অতীত
এই ভবনের অতীত ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। ১৯৭১ সালের আগে এটি ছিল পাকিস্তানপন্থী উর্দু দৈনিক ‘পাসবান’-এর কার্যালয় ও ছাপাখানা। স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এলে ১৯৭২ সালে এর নিয়ন্ত্রণ নেন শেখ ফজলুল হক মণি। এখান থেকেই শুরু হয় ‘বাংলার বাণী’।

১৯৭৩ সালে শেখ মণি বড় চমক দেখান, ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও সংবাদের আহমেদুল কবিরকে সাথে নিয়ে জার্মানি থেকে কিনে আনেন সর্বাধুনিক ‘গজ অফসেট প্রিন্টিং মেশিন’। গড়ে তোলেন ‘মধুমতি মুদ্রণালয়’।

কিন্তু ৭৫-এর ১৫ই আগস্টে শেখ মণি নিহত হলে ভবনটির ওপর মণি পরিবারের নিয়ন্ত্রণ আলগা হয়ে যায়। সামরিক শাসন, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সময়ে এটি সরকারের আইনি জালে আটকে থাকে এবং ব্যবসায়ী ও ছাপাকানায় ভাড়া দেয়া হয়।

দীর্ঘদিন পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে শেখ মণির ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেন।

সাংবাদিকদের আটকে রাখার অভিযোগ
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ভবনটি আগে আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও এখন এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। জানা গেছে, তার দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে এই ভবন নিয়ন্ত্রণ করেন নুরু।

এছাড়াও, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরের এই ভবন দখলের বিষয়ে যখন সমালোচনা তুঙ্গে, তখন গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে, একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে কয়েকজন সংবাদকর্মীকে আটকে রাখে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা।

তবে ভবন দখলের এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মতিঝিল থানা পুলিশ জানায়, বিষয়টি তাদের জানা নেই।

৫৩ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ৮১ নম্বর মতিঝিল ভবনটি তবে কি কেবল ক্ষমতার বদলের সাথে সাথে হাতবদল হওয়া এক চিরন্তন দখলপুরী? একজন প্রতিমন্ত্রী কি এভাবে দখল বাণিজ্য চালাতে পারেন? অভিযোগ থেকে উঠেছে সেই প্রশ্ন। অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত করে এ বিষয়ে সঠিক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।