মতিঝিলের ৮১ নম্বর ভবন, পরিচিত বাংলার বাণী ভবন নামে। প্রায় ৫৩ বছরের পুরোনো চারতলা এই ভবনের অধিকাংশ অংশ এখন গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ী, ভবনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও আশপাশের ভবনের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। তাদের দাবি, ভবনটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের অনুসারীরা।
ভবনটির তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ওঠার সিঁড়ির মুখে কেচিগেটে তালা দেওয়া রয়েছে। সেখানে আগে আওয়ামী লীগ নেতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের ল’ চেম্বার ও রাজনৈতিক কার্যালয় ছিল। ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্যক্রম চলছে। এই অংশটি দখলে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
৫ আগস্টের পর কয়েক দফা দখলের চেষ্টা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভবনটি ঘিরে কয়েক দফা দখলের চেষ্টা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। প্রথমে বিক্ষুব্ধ জনতা ভবনটিতে হামলা চালায়। পরে সমন্বয়ক পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিছুদিন তারা সেখানে প্রভাব বিস্তার করলেও বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ভবনের ভাড়াটে ব্যাংকের কাছ থেকে ভাড়া নিতে পারেননি। পরে তারা সরে যান।
এরপর বিএনপির কিছু নেতাকর্মীও ভবনটি দখলের চেষ্টা করেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তারাও কিছুদিন পর সরে দাঁড়ান। এরপর গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা ভবনটিতে অবস্থান নেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নুরুল হক নুরের আত্মীয় পরিচয় দেওয়া সারোয়ার হোসেন সানী ভবনটি নিয়ন্ত্রণ করেন। তার দলীয় পদ-পদবি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তার সঙ্গে সুমন নামে আরেক ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি বিএনপির একটি অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গণঅধিকার পরিষদের আরও কয়েকজন নেতারও ভবনে যাতায়াত রয়েছে বলে তারা জানান।
ভবনের পাশে ও পেছনের অংশে সম্প্রতি একটি রেস্টুরেন্ট চালু হয়েছে। নিচতলায় পানসি নামে রেস্টুরেন্ট চালু করা হয়েছে এবং দ্বিতীয় তলায় একই নামে একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট করার কথা রয়েছে। এর মালিকানায় গণঅধিকার পরিষয়ের পরিচয় দেওয়া কয়েকজন রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
রেস্টুরেন্টের পাশে ওহ চিটাগাং নামে পান, সিগারেট, ডাবসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রির একটি দোকান রয়েছে। এর মালিক মামুন বাবু জানান, তিনি সুমনের কাছ থেকে মাসে ৬ হাজার টাকা ভাড়ায় দোকানটি নিয়েছেন। সুমন বিএনপির একটি অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং এলাকায় রাজনীতি করেন বলেও তিনি জানান।
পার্শ্ববর্তী একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী আশিকের ভাষ্য, ভবনটি আগে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন অন্যরা সেটি নিয়ন্ত্রণ করছেন।
ব্যাংকের ভাড়া নেওয়া নিয়ে চাপের অভিযোগ
ভবনটিতে থাকা প্রিমিয়ার ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, ২০০২ সাল থেকে প্রকৃত মালিক ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে চুক্তি করে ব্যাংকটি ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলা ভাড়া নিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের দুই দিন পর কয়েকজন ব্যক্তি ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় থাকা তাপসের রাজনৈতিক কার্যালয় ও ল’ চেম্বারে প্রবেশ করে সেখানকার বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যান বলে ব্যাংক সূত্রটি জানায়। ভ্যান ভাড়া করে এসব মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরে সমন্বয়ক পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ব্যাংকের শাখায় গিয়ে ভাড়ার টাকা তাদের দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এতে রাজি হয়নি। তাদের কাছে বৈধ কাগজপত্র না থাকা এবং প্রকৃত মালিকের সঙ্গে ব্যাংকের চুক্তি থাকায় ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে অস্বীকৃতি জানানো হয়। ওই ব্যক্তিরা পরে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়েও যোগাযোগ করেন বলে সূত্রটি জানায়। সেখান থেকেও সুবিধা না পেয়ে তারা ভবন থেকে সরে যান।
ব্যাংক সূত্রের দাবি, ৫ আগস্টের পর কিছু দুর্বৃত্ত ব্যাংকের শাখাতেও লুটপাটের চেষ্টা করেছিল। তবে শাখার কর্মীদের চেষ্টায় তা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী সময়ে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরের পরিচয় দিয়ে ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ব্যক্তিরাও ব্যাংকের কাছে ভাড়া দাবি করেন বলে সূত্রটি জানায়। এ সময় চাপ প্রয়োগ এবং ভাড়া না দিলে ব্যাংকের শাখা সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ এসব বিষয়ে নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চাননি।
ভবনের বর্তমান চিত্র
সরেজমিনে দেখা যায়, চারতলা ভবনটির সামনে ও পেছন—দুই দিক থেকেই প্রবেশের ব্যবস্থা রয়েছে। মেট্রোরেলের পাশের সামনের অংশে প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় প্রিমিয়ার ব্যাংকের কার্যক্রম চলছে। ডান পাশ দিয়ে প্রবেশ করলে তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। তবে সিঁড়ির মুখে কেচিগেটে তালা থাকায় ওপরের দুই তলায় যাতায়াত করা যাচ্ছে না।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, আশপাশের ভবন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণঅধিকার পরিষয়ের পরিচয় দিয়ে দলটির নেতাকর্মীরাই ওই তালা লাগিয়ে ওপরের অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বলে তাদের দাবি।
ভবনের পেছনের অংশে আগে স্থায়ী কোনো কার্যক্রম ছিল না। আমের মৌসুমে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস সেখানে আম মজুতের জন্য জায়গা ভাড়া নিত। বর্তমানে নিচতলায় পানসি নামের রেস্টুরেন্ট চালু হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় একই নামে চাইনিজ রেস্টুরেন্ট করার প্রস্তুতি চলছে। এই অংশের এক পাশে ৮০ নম্বর সাধারণ বীমা ভবন এবং অন্য পাশে ৮২ নম্বর আলহাজ টাওয়ার।
বাংলার বাণী ভবন দখলের বিষয়ে মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান তালুকদার জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগও থানায় আসেনি।
উর্দু দৈনিক থেকে বাংলার বাণী
১৯৭১ সালের আগে ভবনটি ছিল উর্দু দৈনিক পাসবানের কার্যালয় ও ছাপাখানা। পাকিস্তানপন্থি পত্রিকাটি তখন মতিঝিল থেকে প্রকাশিত হতো। স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ভবনটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে দায়মুক্তির সুযোগে ১৯৭২ সালে শেখ ফজলুল হক মণি এর নিয়ন্ত্রণ নেন। সেখানেই শুরু হয় বাংলার বাণীর কার্যক্রম। প্রথমে সাপ্তাহিক এবং পরে দৈনিক হিসেবে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।
১৯৭৩ সালে শেখ ফজলুল হক মণি ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও সংবাদের আহমেদুল কবিরকে সঙ্গে নিয়ে জার্মানি থেকে তৎকালীন সময়ের আধুনিক গজ অফসেট প্রিন্টিং মেশিন আনেন। মধুমতি মুদ্রণালয় নামে সেই ছাপাখানা থেকে বাংলার বাণী ছাপা হতো।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে শেখ ফজলুল হক মণি নিহত হন। এরপর বাংলার বাণীর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং ভবনটির ওপর মণি পরিবারের নিয়ন্ত্রণও কমে যায়। সামরিক শাসন, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শাসনামলে ভবনটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরিত্যক্ত সম্পত্তির মামলায় আটকে থাকা ভবনটি পরে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। ভবনের এক অংশে মধুমতি মুদ্রণালয় নামে বাণিজ্যিক ছাপাখানার কার্যক্রমও চলত।
২০০৯ সালে তাপসের নিয়ন্ত্রণে ফেরে ভবন
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ২০০৯ সালে শেখ ফজলুল হক মণির ছোট ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ভবনটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান। সেখানে তিনি ল’ চেম্বার খোলেন। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হওয়ার পরও ভবনটি তার প্রধান রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
২০০৯ সালের ২১ অক্টোবর ভবনের নিচে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তখন তাপসকে লক্ষ্য করেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবারও ভবনটি দখলের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা ভবন থেকে শেখ ফজলে নূর তাপসের নামফলক নামিয়ে দেয়। কয়েকদিন পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় দেওয়া লোকজন ভবনটিকে ফ্যাসিবাদের প্রতীক উল্লেখ করে দখলমুক্ত করার ঘোষণা দেয়।
এরপর কয়েক দফা দখলচেষ্টার মধ্য দিয়ে বর্তমানে ভবনটির অধিকাংশ অংশ গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ী, ভবনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও আশপাশের ভবনের কর্মীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন:







