ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্বে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার হুমকির মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও বিএনপি ও জামায়াতের বিরোধ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। এর মধ্যে জামায়াত ও এনসিপির নেতৃত্বে একের পর এক লংমার্চ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।
দলগুলোর নেতাদের পালটাপালটি বক্তব্যের কারণে পরিস্থিতিতে উত্তাপও বাড়ছে। এর মধ্যেই গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা হয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির মধ্যে অনৈক্য তৈরি হলে পরাজিত শক্তি তার সুযোগ নিতে পারে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, অশুভ আঁতাত নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তবে ক্ষমতাসীন দলকে আরও সতর্ক ও কৌশলী হতে হবে। তাঁর মতে, যুদ্ধের সময়ও কৌশলগত সংলাপ চলে। তাই সরকারকে বিরোধী দলের সঙ্গে সংসদীয় রীতিতে সমঝোতার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনমূলক কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো দ্বন্দ্বে জড়ালে দেশের সবার ক্ষতি হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে অতীতে হওয়া অন্যায়, অবিচার ও অপকর্ম অব্যাহত থাকলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি ব্যর্থ হলে জামায়াত বা আওয়ামী লীগ আসতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার সরকার ও বিরোধী দলকে সংলাপে বসে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান। তা না হলে অরাজকতার পরিণতি বাংলাদেশের জনগণকে ভোগ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার গুঞ্জন
বিএনপির সূত্রগুলো জানাচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমঝোতার গুঞ্জনে দল দুটির মধ্যে সন্দেহ-অবিশ্বাস কিছুটা বেড়েছে। তবে জামায়াত নেতারা বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ঢাকতে গিয়ে বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে সখ্য রাখার অপপ্রচার চালাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার ফেনীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের অনুসারী ও একটি গুপ্ত বাহিনী জনগণের কল্যাণে সরকারের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে আবারও হাত মিলিয়েছে। তারা দেশে অরাজকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। গুপ্ত রাজনীতি ও ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার সরকারের রাজনীতির বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এর সঙ্গে জড়িত, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে তাদের কোনো কর্মসূচি নেই; বরং তারা কেবল ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে লিপ্ত।
লংমার্চ ঘিরে বিএনপির ক্ষোভ
সূত্রমতে, নির্বাচনের মাত্র সাত মাসের মধ্যে জামায়াত ও এনসিপির লংমার্চ কর্মসূচি নিয়েও বিএনপি ক্ষুব্ধ। সরকারের মেয়াদের এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন বড় কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলেও নানা আলোচনা রয়েছে। অব্যাহত কর্মসূচির কারণে নতুন করে দেশ অচল হয়ে পড়লে পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ দেশে অরাজকতা চাচ্ছে। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রত্যাশা ছিল, সরকার ও বিরোধী দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে দায়িত্বশীল রাজনীতির চর্চা করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতে এ ধরনের বেশ কিছু ইতিবাচক উদাহরণও সৃষ্টি করেছিলেন।
তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ নানা ইস্যুতে দলগুলোর দূরত্ব এখন স্পষ্ট। বিএনপি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সদ্ভাব বজায় রাখার কথা বললেও এখন পর্যন্ত নতুন করে পারস্পরিক বৈঠক বা আলাপের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বিএনপির একটি বড় অংশের মতে, সব রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করে সমঝোতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনাই সরকারের জন্য টেকসই সুফল বয়ে আনবে।
ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী বলেন, একটি কার্যকর সংসদীয় গণতান্ত্রিক সমাজে বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা সংসদেই হওয়ার কথা। সরকারের বয়স মাত্র ৬-৭ মাস হওয়ার পরেই রাজপথে নামার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সব ধরনের বিরোধ ও মতপার্থক্য জাতীয় সংসদে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু সেটি না করে জামায়াত অন্য পথে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গুপ্ত বলতে যাদের বোঝানো হচ্ছে, তারা যদি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচারী শক্তির সঙ্গে ঐক্য করে, তাহলে দুটিই ডুববে। বাংলাদেশের জনগণ তাদের কখনোই মেনে নেবে না। জনগণ ভবিষ্যতেও এ দেশে স্বৈরাচারী শক্তি বা হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান দেখতে চায় না। এ ধরনের অশুভ আঁতাত সফল হবে না।
জামায়াতের অবস্থান নিয়ে বিএনপির প্রশ্ন
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব কিংবা সমঝোতার প্রশ্ন আসে তার আসল চরিত্র বোঝার পর। জামায়াতের আসল চরিত্র বোঝা কঠিন। অতীতে তারা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের বন্ধু হয়েও আকস্মিকভাবে অবস্থান পরিবর্তন করেছে।
তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিকে না জানিয়ে জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে যায়। ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারকে হটাতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমান্তরালভাবে রাজপথে আন্দোলন করে। ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘদিন বিএনপির পাশে থেকে ২০০১ সালে মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেও এক-এগারোর পর আবার বিএনপির দায় নিতে অস্বীকার করে।
আলাল বলেন, ঘন ঘন দিক পরিবর্তনকারী দলকে বোঝা কঠিন। তাই জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা বা দ্বন্দ্ব—উভয় ক্ষেত্রেই গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। জামায়াত সঠিক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন না করে এভাবে দিক বদলাতে থাকলে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগও তাদের পুরোপুরি বিশ্বাস করবে না।
জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি একত্রে আন্দোলন করেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অনেক জায়গায় জামায়াত ও আওয়ামী লীগ একত্রিত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছে বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও অর্জিত গণতন্ত্র রক্ষায় জামায়াতের সচেতন থাকা উচিত। জামায়াত যেন কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের সঙ্গে হাত না মেলায়। ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সমঝোতা করলে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা বিপন্ন হবে এবং ফ্যাসিস্টরাই লাভবান হবে।
জুলাই সনদ ও ভারত সম্পর্ক নিয়ে মতদ্বৈধতা
জামায়াতের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে দলটির মতদ্বৈধতা রয়েছে। সরকারকে চাপে ফেলে আরও কিছু দাবি আদায় করার পাশাপাশি সরকারের ব্যর্থতার চিত্র জনমনে তুলে ধরে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পথ তৈরির কৌশলও নিয়েছে দলটি।
শনিবার মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি তাদের ভারতপ্রীতি ও দিল্লিপ্রীতি ঢাকতে গিয়ে অসত্য কথা বলছে। সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার আওয়ামী লীগ কীভাবে সারা দেশে একদিনে মিছিল করার সুযোগ পায় এবং প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন এলাকায় নিষিদ্ধ দল মিছিল করার দুঃসাহস কীভাবে পায়—এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঐক্য ধরে রাখতে সরকার কোনো উদ্যোগ নিলে জামায়াত সহযোগিতা করবে। তবে আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসে সরকার সেটি করবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, আওয়ামী লীগকে বিএনপিই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। সরকার তা না করে বিরোধী দলের মোকাবিলায় আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আরও পড়ুন:







