শনিবার

৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

মিষ্টি-গাজী নজরুলের আগে বিতর্কে জড়ানো এমপিদের পরিণতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১০

শেয়ার

মিষ্টি-গাজী নজরুলের আগে বিতর্কে জড়ানো এমপিদের পরিণতি
ছবি বাংলা এডিশন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরুর পর ভিন্ন কারণে বিতর্কে জড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম ও বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি।

গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল আছেন। অন্যদিকে, ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নাম আসার পর পদত্যাগ করেন মিষ্টি।

অতীতেও বিতর্ক ও বিভিন্ন অভিযোগের জেরে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দলীয় বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। অন্তত পাঁচজন সংসদ সদস্য বিভিন্ন কারণে আসন হারিয়েছেন। অন্তত চারজন দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন। আবার দলবদল ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করার ঘটনায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কয়েকজন সংসদ সদস্য পদ হারিয়েছেন।

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী

টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এর জেরে ১২ অক্টোবর তাকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়। একই দিন আওয়ামী লীগের বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সভাপতিমণ্ডলীর পদ থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং দলীয় সদস্যপদ সাময়িক স্থগিত করা হয়।

২৪ অক্টোবর আওয়ামী লীগ তার প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করে তাকে বহিষ্কার করে। দেশে ফেরার পর নভেম্বরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় নয় মাস কারাগারে ছিলেন তিনি।

তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের চিঠি চালাচালি হয়। কমিশন শুনানির উদ্যোগ নিলে ২০১৫ সালের আগস্টে আদালতে গিয়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করেন লতিফ সিদ্দিকী। পরে কমিশনের শুনানিতে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কথা জানান। ১ সেপ্টেম্বর সংসদে দেওয়া বক্তব্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। এ সিদ্ধান্তের পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছার কথা বলেছিলেন লতিফ সিদ্দিকী।

মুরাদ হাসান

২০২১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে অশ্লীল মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এবং জামালপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুরাদ হাসান। এ সময় তার একটি ফোনালাপের অডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক চিত্রনায়িকার সঙ্গে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার ও তাকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়েও তিনি আপত্তিকর বক্তব্য দেন।

প্রতিক্রিয়ার মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৮ ডিসেম্বর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন মুরাদ হাসান। একই সময় জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যাবিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয়।

তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের দাবি উঠলেও তিনি পদত্যাগ করেননি। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে রিট হয়। মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য পদে বহাল ছিলেন।

গোলাম মাওলা রনি

আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনিকে ২০১৩ সালে দুই সাংবাদিককে পেটানোর ঘটনায় কারাগারে যেতে হয়েছিল। পরের নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন পাননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে পটুয়াখালী-৩ আসনে দলটির মনোনয়ন পান।

মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল

২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুল। বিপুল অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমানকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিয়ে বিজয় নিশ্চিত করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

কুয়েতে মানব পাচার ও ভিসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হওয়ার অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় ২০২০ সালের জুনে কুয়েতে গ্রেপ্তার হন তিনি।

ঘুষ লেনদেনের মামলায় ২০২১ সালের ২৮ জানুয়ারি কুয়েতের আদালত তাকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার জরিমানা করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ সচিবালয় তার আসন শূন্য ঘোষণা করে।

আবুল কাশেম

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইল-৫ আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবুল কাশেম মহাজোটের হয়ে নির্বাচিত হন। তাকে ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপি উল্লেখ করে ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন পরাজিত বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হাসান।

আবেদনে সোনালী ব্যাংকে তার ১৫ কোটি ৪৪ লাখ ২৫ হাজার ৪৩৭ টাকা ঋণ এবং ময়মনসিংহ টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৩২ হাজার ১১০ টাকা ফোন বিল বকেয়া থাকার কথা বলা হয়।

শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল তার সংসদ সদস্য ঘোষণা-সংক্রান্ত গেজেট অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন। আপিল বিভাগে গেলে ২০১২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তার আপিল খারিজ হয়। ফলে সংসদ সদস্য পদ হারান আবুল কাশেম।

মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও মেজর জসিমউদ্দিন

ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দুর্নীতির দায়ে আওয়ামী লীগ নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ১৩ বছরের কারাদণ্ড হয়। ২০ মাস কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের অক্টোবরে মুক্তি পান তিনি।

২০০৮ সালের নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তার মনোনয়নপত্র প্রথমে বাতিল করা হলেও আইনি লড়াইয়ে প্রার্থিতা বহাল হয়। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর দণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় বিজয়ের অভিযোগে মামলা হয়। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর নির্বাচন কমিশন তার আসন শূন্য ঘোষণা করে।

একই নির্বাচনে ভোলা-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হন মেজর (অব.) জসিমউদ্দিন। ২০০৪ সালের আগস্টে তাকে সেনাবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর পাঁচ বছর পূর্ণ না হলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্যতার বিষয়টি তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে রিট করেন বিএনপির প্রার্থী হাফিজ উদ্দিন আহমদ। আইনি লড়াইয়ের পর উচ্চ আদালত তার সংসদ সদস্য পদ অবৈধ ঘোষণা করলে নির্বাচন কমিশন আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।

৭০ অনুচ্ছেদে পদ হারানো সংসদ সদস্য

কিশোরগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান ২০০০ সালে দলীয় সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্ত অমান্য করে অধিবেশনে যোগ দেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার আসন শূন্য হয়। আদালতে চ্যালেঞ্জ করেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেননি। সপ্তম সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার আগপর্যন্ত আসনটি শূন্য ছিল।

সিরাজগঞ্জ-৭ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন ১৯৯৮ সালে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে উপমন্ত্রী হন। ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতায় তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান।

একইভাবে রাজশাহী-৫ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হলে তার আসন শূন্য হয়। পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি আবার সংসদ সদস্য হন।

দল থেকে বহিষ্কার হলেও পদ বহাল

২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়নে আটজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মৌলভীবাজার-২ আসনের গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ২০১৯ সালের ৭ মার্চ শপথ নিলে সেদিনই তাকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হয়।

২৫ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের বিএনপির জাহিদুর রহমান শপথ নেন। দুই দিন পর তাকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কারের কারণে তাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি।

পরে বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং দলের চারজন সংসদ সদস্য ২৯ এপ্রিল শপথ নেন। বগুড়া-৬ আসনের নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় ওই আসনে উপনির্বাচনে বিএনপির গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ জয়ী হয়ে শপথ নেন। পরে জাহিদুর রহমানের বহিষ্কারাদেশও প্রত্যাহার করে বিএনপি।

২০০৮ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম গোলাম রেজা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জীবনবৃত্তান্ত ও সংসদে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগে ২০১২ সালের অক্টোবরে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি।

অষ্টম সংসদে রাজশাহী-৪ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য আবু হেনা ২০০৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। রাজশাহীর বাগমারায় মানুষ উগ্রবাদীদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর তিনি ওই বক্তব্য দেন। পরে বিএনপি তাকে বহিষ্কার করে। তবে তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার তার সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেন।