আল্লামা আহমদ শফী থেকে মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী—হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতৃত্বকে বরাবরই দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে কঠোর বিরোধিতায় সরব থাকতে দেখা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিরোধিতা যেন হয়ে উঠেছে আরও তীব্র, আরও আক্রমণাত্মক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন এই বিরোধিতা? কোনো আদর্শিক দ্বন্দ্ব, নাকি দলীয় কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ?
শাপলা চত্বরে হেফাজতের আন্দোলন
রবিবার (৫ মে) ২০১৩ সালে—শাপলা চত্বর। তথ্য বলছে, বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যখন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ভাড়াটে বাহিনীর মুহুর্মুহু গুলিতে ছত্রভঙ্গ হয়ে দিকবিদিক ছুটছিলেন, তখন সে সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরাই হেফাজতের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ঐতিহাসিক এই আন্দোলনকে।
তবে হেফাজতের ওই আন্দোলনে দলটির ব্যাপক অংশগ্রহণের তথ্য থাকলেও জামায়াতের সঙ্গে হেফাজতের বিরোধ কখনোই দূর হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই সম্পর্কই যেন রূপ নিয়েছে সাপ-নেউলের সম্পর্কে।
বাবুনগরীর সমালোচনা ও নির্বাচনী অবস্থান
নির্বাচনের আগে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বর্তমান আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীকে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বেশ সমালোচনা করতে দেখা যায়।
কখনো সেই সমালোচনা প্রতিফলিত হয়েছে ব্যক্তিগত আক্রমণে, আবার কখনো তা প্রকাশ পেয়েছে জামায়াতের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও প্রকাশ্য বিষোদ্গারে।
সেই সঙ্গে, জাতীয় সংসদের গত নির্বাচনে ভোটের মাঠে জামায়াতের কঠোর বিরোধিতায় সমালোচনার মুখে পড়েন কওমি অঙ্গনের এই শীর্ষ মুরুব্বী।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। যার বাস্তব উদাহরণ পরিলক্ষিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।
একদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক সমীকরণের বিপরীতমুখী অবস্থান, অন্যদিকে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনী মাঠে ভোট কালেকশন, এসবের পাশাপাশি হেফাজতের নেতৃত্ব নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি করেছে বলে মত অনেক বিশ্লেষকের।
অন্যদিকে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী ও সাবেক গণঅধিকার পরিষদ নেতা রাশেদ খানের সঙ্গে হেফাজত প্রধানের ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত নিয়েও চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
বিরোধের কারণ নিয়ে দাবি
অপরদিকে দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের সঙ্গে হেফাজতের চলমান এই বিরোধের কারণ উঠে আসে দলীয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছ থেকে।
সেইসঙ্গে হেফাজত নেতা আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ক্ষোভ ও কট্টর বিরোধিতার ভিন্ন কারণও পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট মহলে। অনেকে বাবুনগরীর জামায়াতের প্রতি এই আক্রোশকে, নির্দিষ্ট একটি ইসলামী দলের কানপড়া হিসেবেও দেখছে।
তবে দলটির একাধিক নেতৃবৃন্দের দাবি, হেফাজতের সঙ্গে জামায়াতের বিরোধ কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয়, বরং ধর্মীয় ও আকিদাগত মতপার্থক্য থেকেই এই বিরোধের সূত্রপাত।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া ও হেফাজতের সরকারঘনিষ্ঠতা
এদিকে, ইসলামী ঘরানার অন্যতম বৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের কণ্ঠে জামায়াতকে নিয়ে বারবার বিষোদ্গার করা হলেও, বিপরীতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে হেফাজতের বিপক্ষে কখনোই প্রকাশ্যে কোনো পাল্টা বক্তব্য কিংবা কঠোর প্রতিক্রিয়া আসতে দেখা যায়নি।
উল্টো রবিবার (৫ মে) ২০১৩ সালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সংঘটিত হেফাজতের আন্দোলনে শত শত আলেম-উলামা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের হত্যাকাণ্ডের কারনে বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
অন্যদিকে জানা যায়, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সরকারঘনিষ্ঠতা নতুন কিছু নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রতিনিয়ত ওঠাবসা সে সময় হেফাজতের নেতৃত্ব নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা তৈরি করে।
বিশেষ করে বায়তুল মোকাররমের সাবেক খতিব মুফতি রুহুল আমিনের শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধিতে ভূষিত করা, সেই সঙ্গে শোলাকিয়ার সাবেক ইমাম মুফতি ফরিদ উদ্দিন মাসউদের ২০১৩ সালের শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে উপস্থিতি—ইসলামী ঘরানার সর্বমহলে চরম বিতর্ক সৃষ্টি করে।
পাশাপাশি ২০১৭ সালে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস সনদের স্বীকৃতির প্রেক্ষিতে রবিবার (৪ নভেম্বর) ২০১৮ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত শোকরানা মাহফিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হেফাজতের সাবেক আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর উপস্থিতি নিয়েও সে সময়ে কওমি অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
একসময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, অন্যদিকে সময়ের পালাবদলে ভিন্ন কৌশল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এটা কি কেবলই ধর্মীয় ও আকিদাগত মতপার্থক্য? নাকি আকিদার আড়ালেও রয়েছে কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ? আর সেই প্রশ্নের উত্তরেই যেন চোখ আটকে আছে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের।
আরও পড়ুন:







