শনিবার

৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

ঘরে-বাইরে নজর বিএনপির, মাঠপর্যায়েও সতর্কতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২৫

শেয়ার

ঘরে-বাইরে নজর বিএনপির, মাঠপর্যায়েও সতর্কতা
ছবি সংগৃহীত

জাতীয় সংসদ থেকে ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগের পরদিন জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ঘটনা দুটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর বিষয়ে কঠোর বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি অন্য দলের কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলেও ছাড় না দেওয়ার অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে।

বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগ, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া এবং ১৪ জনকে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে অপরাধপ্রবণ নেতা-কর্মীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানানো হয়েছে। জেলা পর্যায়ের নেতাদেরও মৌখিকভাবে সতর্ক করে সাংগঠনিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতা-কর্মীর নাম আসে। তাঁদের অনেকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ বা অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মুখে বিএনপি তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেয়।

অন্যদিকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে বৃহস্পতিবার রাতে করা মামলায় শুক্রবার বিকেলে আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিএনপির সাবেক এই নেতা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। তিনি দলটির সহযোগী সদস্য; কোনো পদে নেই।

মাঠপর্যায়েও নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ

বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, নিজ দলের শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তৎপরতার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির বিভিন্ন সরকারবিরোধী কর্মসূচি ও বক্তব্যের ওপর সরকার নজর রাখছে। সরকারপ্রধান ও মন্ত্রীদের কটাক্ষ করে বিরোধী দলের নেতাদের দেওয়া বক্তব্যও পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যেন বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ না পায়, সে বিষয়েও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সতর্ক রয়েছে।

বিএনপির জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বকে নিজ নিজ এলাকায় নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কোনো নেতা বা কর্মী অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাঁকে প্রশ্রয় না দেওয়া এবং দ্রুত বিষয়টি কেন্দ্রকে জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ব্যক্তিগত স্বার্থে দলের নাম ব্যবহার কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।

দলের নেতাদের সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী

বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনেক আগেই সবাইকে সতর্ক করে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি সংসদ সদস্যদের বৈঠকে এবং প্রতিটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বারবার সবাইকে সতর্ক করছেন। জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন। দলের নেতাদের নিজ নিজ দায়িত্বাধীন এলাকার আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন সমন্বয় ও সন্ত্রাস দমনে তৎপর হতে বলেছেন।

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দুটি গুরুত্বপূর্ণ সভা করেন। এর একটি ছিল জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদানের আগের দিন। এতে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, সব যুগ্ম মহাসচিব, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকেরা উপস্থিত ছিলেন। অন্য সভাটি হয় বিএনপি ঘরানার টক শোর আলোচকদের নিয়ে।

সূত্রটির ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী গুপ্ত ও নিষিদ্ধ শব্দ ব্যবহার করে দুটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টার অভিযোগ তুলে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন।

ওই দুটি বৈঠকের একটিতে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তাঁর মনে হয়েছে, সরকার নিজ দল এবং গুপ্ত ও নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করা দলগুলো—অর্থাৎ ঘরে-বাইরে সবার বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিয়ে এগোনোর পরিকল্পনা করছে।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে বাহিনীগুলোর তৎপরতা

সরকার ও বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নীতিগত অবস্থান হচ্ছে ঘটা করে বিশেষ কোনো নাম দিয়ে অভিযান না চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীকে আরও সক্রিয় করা। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বাহিনীগুলোর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে কার্যকর অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিপ্রচার বা হইচই না করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি ও বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির কোনো যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে কি না, তা নজরে রাখা হচ্ছে।

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের মতে, ফেরদৌসী আহমেদের ঘটনায় দলের পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নয়। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা অপরাধে জড়ালে কী পরিণতি হতে পারে, সে বিষয়ে একটি দৃষ্টান্ত তৈরির চেষ্টা হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের তৎপরতার দিকে নজর রাখার পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার বিষয়েও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গুরুত্ব দিচ্ছে।