শুক্রবার

২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পদের উৎস জানতে চেয়ে হাসনাতের ফেসবুক পোস্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪১

শেয়ার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পদের উৎস জানতে চেয়ে হাসনাতের ফেসবুক পোস্ট
ছবি সংগৃহীত

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পুরোনো দুর্নীতি মামলা, সম্পদের পরিমাণ ও এর উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে সালাহউদ্দিন আহমদের সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।

পুরোনো দুর্নীতি মামলার প্রসঙ্গ

হাসনাত আব্দুল্লাহ তার পোস্টে উল্লেখ করেন, ২০০৭ সালে এক কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছিল। ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার বিশেষ আদালত ওই মামলায় তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে এক কোটি টাকা জরিমানা এবং ঘুষ হিসেবে নেওয়া অর্থ বাজেয়াপ্তের আদেশ দেওয়া হয় বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।

হাসনাতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আকতার হোসেন লিমিটেডের মালিক মীর জহির হোসেনের কাছ থেকে সরকারি কাজের সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে ওই অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ছিল মামলায়। জরিমানার টাকা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড এবং ঘুষের এক কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্তের আদেশও দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।

এ ছাড়া ২০০৮ সালে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে চার কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে করা আরেকটি দুর্নীতি মামলার কথাও পোস্টে উল্লেখ করেন হাসনাত। তার দাবি, ওই মামলায় ১০ বছর ও তিন বছরের সাজা মিলিয়ে ১৩ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল।

চকরিয়ায় মাছের ঘের দখল নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে করা দুটি মামলার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। হাসনাত বলেন, বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালে মামলা দুটি করা হয়েছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ওই দুই মামলা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ খালাস পান।

হাসনাত আরও বলেন, ওই রায়ের পর সালাহউদ্দিন আহমদ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। বিএনপির বর্তমান সরকারের অনেক মন্ত্রীও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতির মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন এবং তারা দুদকের মামলাগুলোকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বলে দাবি করেছিলেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।

এমপি-মন্ত্রীদের ব্যাংক হিসাব তলবের দাবি

বর্তমান সময়ে বিএনপি সরকারের অধীনে দুদকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন হাসনাত। তিনি বলেন, এর অংশ হিসেবে বিএফইউআইয়ের মাধ্যমে সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্র যে কারও ব্যাংক হিসাব চাইতে পারে উল্লেখ করে হাসনাত প্রশ্ন তোলেন, সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার পর ব্যাংক হিসাব তলব করা হলে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কি না। রাষ্ট্রীয় কল্যাণের জন্য ব্যাংক হিসাব তলব করা হলে প্রত্যেক এমপি-মন্ত্রীর ব্যাংক হিসাবও তলব করা উচিত বলে দাবি করেন তিনি।

গুলশানের সম্পদ ও সম্পদ বৃদ্ধির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন

হাসনাত তার পোস্টে গুলশানে সালাহউদ্দিন আহমদের সম্পদ, সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় এবং এসব সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

তার দাবি, প্রায় ২০ বছর আগে সালাহউদ্দিন আহমদ গুলশানের দামি ও বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স প্লাটিনাম রেসিডেন্সে একটি অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হন। গুলশানে তার একাধিক বাড়ি ও সম্পদ রয়েছে বলেও আলোচনা আছে বলে উল্লেখ করেন হাসনাত।

হাসনাতের পোস্টে বলা হয়, ২০০৮ সালের নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী সালাহউদ্দিন আহমদ ও তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ দম্পতির মোট সম্পদ ছিল ৬ দশমিক ৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে তা বেড়ে ১২ দশমিক ৭ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৩০ কোটি টাকা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এসব সম্পদের উৎস কী, সেই প্রশ্ন তোলেন হাসনাত।

সরকারি চাকরি থেকে সম্পদ অর্জন নিয়ে প্রশ্ন

সালাহউদ্দিন আহমদ ৮৫ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে ১৯৯৬ সালে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে তার ব্যবসা করার সুযোগ ছিল না। ওই বছর সিনিয়র সহকারী সচিব পদ থেকে চাকরি ছাড়ার সময় বেতন-ভাতাসহ তার মাসিক আয় সর্বোচ্চ ছয় হাজার টাকা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

হাসনাতের বক্তব্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ওই ছয় হাজার টাকা বর্তমান বাজারে ৪০ হাজার টাকারও কম অর্থের সমান। তিনি দাবি করেন, প্রায় ২০ বছর আগেও গুলশানে ফ্ল্যাটের দাম প্রতি বর্গফুট কমপক্ষে সাড়ে তিন হাজার টাকা ছিল এবং তিন হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের দাম তখনই কোটি টাকা হতো।

এ অবস্থায় ছয় হাজার টাকা বেতন পাওয়া একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট কিনতে পারেন, সেই প্রশ্ন তোলেন হাসনাত।

তিনি আরও বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী থাকায় সালাহউদ্দিন আহমদের ব্যবসা করার সুযোগ ছিল না। এর পরের দুই বছর তিনি কারাগারে ছিলেন। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপি বিরোধী দলে ছিল বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন হাসনাত।

চাকরি থেকে রাজনীতিতে এসে সংসদ সদস্য হওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ ওই সময় কী ব্যবসা করেছিলেন এবং প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পরের কয়েক বছরে কীভাবে গুলশানে সম্পদের মালিক হলেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার ব্যয়ের উৎস জানতে চাওয়া

সালাহউদ্দিন আহমদের সন্তানদের পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতে পড়াশোনা করানো হয়েছে বলেও পোস্টে দাবি করেন হাসনাত। দীর্ঘ সময় বিদেশে উচ্চশিক্ষার পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থের উৎস কী ছিল, তা জানতে চান তিনি।

হাসনাত প্রশ্ন করেন, সালাহউদ্দিন আহমদের সম্পদের কতটা আয়, কতটা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এবং কতটা বিনিয়োগ বা অন্য কোনো উৎস থেকে এসেছে, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা আছে কি না। সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার জন্য বিপুল অর্থ কীভাবে বৈধভাবে বিদেশে পাঠানো হয়েছে, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি দাবি করেন।

একজন সরকারি কর্মকর্তা থেকে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে তার ঘোষিত আয়, সম্পদ বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য আছে কি না, জনস্বার্থে তা তদন্তের দাবি জানান হাসনাত।

পোস্টের শেষ অংশে তিনি বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদের বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী এবং এর পক্ষে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য হিসাব রয়েছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এমপি-মন্ত্রীদের নিকটাত্মীয় ও আত্মীয়স্বজনের ব্যাংক হিসাবও প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় স্বার্থে তলবের দাবি জানান হাসনাত। এ প্রক্রিয়া তাকে দিয়ে শুরু করার আহ্বান জানিয়ে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দায়িত্ব গ্রহণের আগে ও পরে সম্পদের হিসাব প্রকাশের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।