দলীয় শৃঙ্খলা ও ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। এরই অংশ হিসেবে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) তিনি পদত্যাগ করেন।
একই সময়ে ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি, ঢাকা মহানগরী উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগরী পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধে ছাড় নয়
দলের নাম ভাঙিয়ে দখল, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও আধিপত্য বিস্তারের মতো কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগে বিএনপির হাইকমান্ড ক্ষুব্ধ বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এসব ঘটনাকে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে না দেখে দল ও সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত করে দেখছে দলটির নীতিনির্ধারক মহল।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি বা দখলদারিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগে ইতোমধ্যে কয়েকজন নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার বা পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলছে। এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
মিরপুরের রাড্ডা কেন্দ্রের ঘটনায় এমপির পদত্যাগ
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি পদত্যাগ করেন। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী খোঁজখবর নিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। এর আগে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) পল্লবীর ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোফিজুর রহমান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা জানানো হয়।
একাধিক কমিটি বিলুপ্ত, ১৪ নেতা বহিষ্কার
মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মহানগরী উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই দিনে ঢাকা মহানগরী উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগরী পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়।
পাশাপাশি বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অনৈতিক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী ও দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে এ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কমিটি বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের যোগসূত্র থাকার কথা জানিয়েছেন।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথা
জাতীয় অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় অনিয়ম ও অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে বলে তিনি মনে করেন। ভবিষ্যতেও এসব বিষয়ে সজাগ থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যের পদত্যাগ, কমিটি বিলুপ্ত করা এবং নেতাদের বহিষ্কারের ঘটনায় দলীয় হাইকমান্ডের কাছে অনিয়মের তথ্য থাকার বিষয়টি বোঝা যায়। যারা অনিয়ম করেছে, তাদের সমর্থন দেওয়া সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা ও দেশের স্বার্থে এ ধরনের ধারা অব্যাহত রাখার কথা বলেন তিনি।
দল ও সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে চাপ
বিএনপির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মধ্যে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার নিজেদের আলাদা ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করছে। এর মধ্যে দলের কিছু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
রাজধানী থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এসব অভিযোগ সামনে আসায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এসব ঘটনাকে সরকারের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে উল্লেখ করে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সারা দেশে দলের আত্মশুদ্ধিমূলক অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছিল।
বিএনপির সূত্র জানায়, অভিযোগের পর শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী পুরো সাংগঠনিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কমিটি বিলুপ্তি ও নেতাদের বহিষ্কারের মাধ্যমে দলীয় পদ বা পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে সাংগঠনিক পরিচয় কোনো সুরক্ষা দেবে না—এমন বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে দলীয় ভাবমূর্তির পাশাপাশি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও সরকারের ভাবমূর্তির বিষয়ও যুক্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি বা প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।
আরও পড়ুন:







