মঙ্গলবার

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩

মিত্র থেকে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:৪১

আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:৪৫

শেয়ার

মিত্র থেকে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত
ছবি সংগৃহীত

আড়াই দশক আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজপথে একসঙ্গে আন্দোলন করা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন সংস্কার, বিরোধী দলকে পাশ কাটানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে।

এই বিভাজনের মধ্যে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট নতুন করে রাজপথের কর্মসূচিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। বিভাগীয় লংমার্চ শেষে শনিবার (১৪ নভেম্বর) ঢাকায় বড় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে জোটটির। সেখান থেকে সংস্কার বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে সরকারকে সময়সীমা বেঁধে আলটিমেটাম দেওয়ার কথা ভাবছেন জোটের শীর্ষ নেতারা। দাবি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ না এলে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

সরকার গঠনের পরপরই জামায়াতের কর্মসূচি ভালোভাবে নেয়নি বিএনপি। অন্যদিকে সংস্কার, দলীয়করণ এবং বিরোধী দলকে উপেক্ষার চেষ্টাকে সহজভাবে দেখছে না জামায়াতও। জামায়াত রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত রাখলে বিএনপি ও দলটির সহযোগী সংগঠনগুলোও পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মহাসমাবেশ থেকে আলটিমেটামের পরিকল্পনা

বিএনপি দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শনিবার (১৪ নভেম্বর) মহাসমাবেশ থেকে সরকারকে এক সপ্তাহ বা কাছাকাছি সময়ের আলটিমেটাম দিতে পারে জামায়াত জোট। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যই এই কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবিতে সেপ্টেম্বর থেকে বিভাগীয় শহরে লংমার্চ শুরু করেছে জোটটি। শনিবার (১০ অক্টোবর) খুলনা ও শনিবার (২৪ অক্টোবর) সিলেটে লংমার্চের পর শনিবার (১৪ নভেম্বর) ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা রয়েছে। তবে বেশি মানুষ জড়ো করার জন্য মহাসমাবেশ এক-দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে বলেও জোটে আলোচনা রয়েছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দলীয় দাবি নয়, তারা গণদাবি নিয়ে রাজপথে রয়েছেন। সরকারের প্রতিটি অন্যায়ের কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি প্রয়োজনে রাজপথে সমুচিত জবাব দেওয়ার কথাও জানান তিনি। তার ভাষ্য, মহাসমাবেশ বৃহৎ পরিসরে করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং সেখান থেকেই পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

জোটের অন্যান্য দলের নেতারাও কর্মসূচির বিষয়ে ইতিবাচক। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, বিরোধী দল বসে থাকবে না। বিএনপিকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফল পেতে হবে। জোটগত কর্মসূচির পাশাপাশি এনসিপি নিজস্ব কর্মসূচি নিয়েও মাঠে থাকবে।

বিএনপিও মাঠে থাকার প্রস্তুতিতে

জামায়াতের আন্দোলনের হুংকারকে গুরুত্ব না দিলেও সতর্কভাবে মাঠে থাকতে চায় বিএনপি। এক সময়ের মিত্র দলটিকে বিএনপি এখন আর মিত্র হিসেবে দেখছে না। দুই দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও সম্পর্ক নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, বিভিন্ন সময়ে জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বা সমঝোতায় ছিল। ১৯৯১ সালে বিএনপিকে সরকার গঠনেও সমর্থন দিয়েছিল দলটি। ২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকারে জামায়াতের দুই নেতা মন্ত্রীও হন। তবে ১/১১-এর সময় জামায়াত বিএনপি সরকারের দুর্নীতির দায় নিতে অস্বীকৃতি জানায়। জামায়াত কার বন্ধু তা বুঝতে তাদের দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, জামায়াতের আন্দোলনকে গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। তারপরও ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী ও জামায়াতের তৎপরতা রুখতে বিএনপি সতর্কভাবে মাঠে থাকবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, শুরু থেকেই জামায়াত ফ্যাসিবাদী কায়দায় হাঁটছে। ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশকে এগিয়ে নিতে বিএনপি জাতীয় ঐক্য চাইলেও জামায়াত তা চাইছে না। এ কারণে দলটি সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দেয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইতিমধ্যে বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলো দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিবাদে কয়েক দিন ধরে কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের চেয়েও জামায়াতের বিরুদ্ধে বেশি বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা।

নির্বাচনের পর থেকেই প্রকাশ্যে মতপার্থক্য

১৯৯৯ সালে বিএনপি ও জামায়াত জোট গঠনের পর দীর্ঘদিন পাশাপাশি পথ চললেও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই মিত্রতায় ফাটল ধরতে শুরু করে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের সময় দুই দলের সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও এক ধরনের সমঝোতা ছিল বলে মনে করা হয়। নির্বাচনে বিএনপি জোট সরকার গঠন করেছে, আর বিরোধী দলে বসেছে জামায়াত-এনসিপি জোট।

নির্বাচনের পর সংস্কার ইস্যু, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের এলাকায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের দিয়ে উন্নয়নকাজ তদারকি, সরকারি বরাদ্দে বিরোধী দলের সদস্যদের প্রতি বৈষম্য এবং সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণ নিয়ে দুই দলের সম্পর্কে আরও ফাটল ধরে।

সংসদে সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়েও দুই দলের দূরত্ব প্রকাশ্যে আসে। বিএনপি সংবিধান অনুযায়ী সংস্কারের কথা বললেও জামায়াত জোট জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ চায়। জামায়াতের সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি তা করেনি।

গত ১৩ জুলাই সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকারি দল ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করলেও জামায়াত ও এনসিপি এর কাঠামোর বিরোধিতা করে কমিটিতে নাম দেয়নি।

অধ্যাদেশ নিয়েও দুই পক্ষের মতবিরোধ

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়েও বিএনপি ও জামায়াতের মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিতভাবে, ১৫টি সংশোধন করে আইন করার এবং ২০টির ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আইন না করার সুপারিশ করে।

পরে ৯৭টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৩টি সংশোধন করে পাস করার কথা জানানো হয়। সাতটি অধ্যাদেশ তামাদি হওয়ার কথাও জানানো হয়।

গণভোট, বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ পরিবর্তন ও বাতিল করা নিয়েও জামায়াত জোটের আপত্তি রয়েছে।

গণভোটের প্রস্তাব নিয়ে বিরোধ

সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ঘোষিত নতুন করে গণভোটের প্রস্তাবেরও সমালোচনা করেছে বিরোধী দল। তারা এই প্রস্তাবকে হাস্যকর বলে বর্ণনা করেছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে বিএনপি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সংস্কার বাস্তবায়নে চাপ সৃষ্টি, সব ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে উপেক্ষা করা বন্ধ এবং জনগণের দাবি পূরণের জন্য কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।

তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান জামায়াতের বক্তব্য এবং তাদের সাম্প্রতিক লংমার্চকে হঠকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন।

দুই দলের অবস্থানে রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন

বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের নতুন সমীকরণের প্রভাব দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান দীর্ঘ হলে সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে বলেও তারা মনে করছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল লতিফ মাসুম মনে করেন, বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘমেয়াদে মুখোমুখি অবস্থান বা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে গেলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সুযোগ নিতে পারে। এতে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

তার মতে, একদিকে আওয়ামী লীগের তৎপরতা মোকাবিলা এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।