সোমবার

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২ আশ্বিন, ১৪৩৩

চাকরির নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে

রবিউল ইসলাম কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৩৮

শেয়ার

চাকরির নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে
ছবি: অভিযুক্ত এনসিপি নেতারা

একটি চাকরি, হাজারটা পরিবারের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। বহুদিনের জমানো দীর্ঘশ্বাস ঘোচানোর স্বপ্ন। কিন্তু কাঁধের ওপর চেপে থাকা বেকারত্বের ভারী বোঝা থেকে বাঁচতে একজন তরুণকে যে কত অদৃশ্য লড়াই লড়তে হয়, তা কেবল সেই হতভাগ্যই জানে।

যখন স্বপ্নের দেখা মেলে না, তখন মরিয়া হয়ে অবৈধ পথে পা বাড়ায় তরুণরা। আর এই হতাশাকে পুঁজি করেই ওত পেতে বসে এক সুবিধালোভী সিন্ডিকেট। ঠিক তেমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাক্ষী হয়েছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা।

জমি বন্ধক রেখে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে, শুরু হয় মোটা অঙ্কের রমরমা লেনদেন। পবিত্র মসজিদের বারান্দা থেকে ক্ষমতার অলিগলি, কোথায় নেই এই প্রতারণার জাল?

অভিযুক্ত এনসিপি নেতারা

ফুলবাড়ীতে পুলিশে চাকরি দেয়ার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগের মূল তালিকায় রয়েছেন, ফুলবাড়ী উপজেলা এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব খলিলুর রহমান, কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েল এবং নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন।

ভুক্তভোগী মো. নাঈম ইসলামের ভগ্নিপতি হাফিজুল মিয়ার সাথে চুক্তি করেন খলিলুর রহমান। বিশেষ কোটায় চাকরি নিশ্চিত ও শতভাগ পাসের লোভ দেখিয়ে নাঈমের পরিবারের কাছে দাবি করা হয় ১৬ লাখ টাকা।

চুক্তির অংশ হিসেবে তিন ধাপে নগদ সাড়ে সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় এই চক্র।

তবে, সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, এই অনৈতিক আর্থিক লেনদেনটি সম্পন্ন হয় পবিত্র ফুলবাড়ীর কাচারী মাঠের মসজিদ বারান্দায়। এরই একটি গোপন ভিডিও ফুটেজ এখন বাংলা এডিশনের হাতে।

লেনদেনের সময় উভয় পক্ষই বিশ্বস্ততা ধরে রাখতে নিজেদের নামে থাকা, ২টি করে ব্যাংক চেক এবং ১০০ টাকার ৩টি ফাঁকা স্বাক্ষরিত স্ট্যাম্প জামানত হিসেবে গচ্ছিত রাখে।

এই গোপন লেনদেনের বিশ্বস্ততার সাক্ষী করা হয় স্থানীয় ১ নং ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সোহরাব হোসেনকে। বাংলা এডিশনের মুখোমুখি হলে সোহরাব দাবি করেন, নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর তাকে জোর করে বৈঠকে বসানো হয় এবং তখনই হাফিজুল হক তাকে লেনদেনের বিষয়টি খুলে বলেন।

সরাসরি ক্যামেরার সামনে কথা না বললেও হাফিজুল মিয়া তুলে ধরেন ঢাকায় ঘটা এক ভয়াল প্রতারণার কথা। টাকা নেয়ার পর তাদের সুকৌশলে ঢাকায় নিয়ে দালাল চক্রের হাতে ফেলে আসা হয়। কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে নাঈমকে নিয়ে পালিয়ে ফিরলেও, আতঙ্কে নাঈমের এসএসসি ও এইচএসসির মূল সার্টিফিকেট সেখানেই ফেলে আসতে বাধ্য হয় তারা।

ভুক্তভোগীর বাড়িতে অনুসন্ধান

অনুসন্ধানের এই পর্যায়ে, টিম বাংলা এডিশন উপজেলার পানিমাছকুটি গ্রামের হামিদুল ইসলামের ছেলে ভুক্তভোগী নাঈমের বাড়িতে পৌঁছায়।

ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও ভুক্তভোগী নাঈম অভিযোগ করেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নাম ভাঙিয়ে চাকরি দেয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।

নাঈমের দাবি, ঢাকার দালালদের খপ্পর থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসার পর পরবর্তীতে চাপের মুখে এনসিপি নেতা মাহমুদুল হাসান জুয়েল, ঢাকায় গিয়ে সার্টিফিকেটগুলো উদ্ধার করে দেন।

চাকরি না পেয়ে পরিবারটি, টাকা ফেরতের চাপ দিলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কিছু টাকা ফেরত দেয়া হলেও, এখনও বকেয়া ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। আর তা পরিশোধের সর্বশেষ আশ্বাস দেয়া হয়েছে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তারিখে।

ছাত্রশক্তির নেতার দাবি

অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে দেখা মেলে ছাত্রশক্তির সদস্য সচিব আজান আহমেদ শাওনের সাথে। গোপন ক্যামেরায় তার বিস্ফোরক দাবি, কারো প্রত্যক্ষ ইন্ধন ছাড়া খলিলুরের পক্ষে সাড়ে সাত লাখ টাকা লেনদেনের দুঃসাহস থাকা অসম্ভব।

শাওনের আঙুল সরাসরি ফুলবাড়ী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক নাজমুল ফেরদৌস লাভলু ও সদস্য সচিব আব্দুল লতিফের দিকে। একই সাথে কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুকুল ও সদস্য সচিব মাসুম মিয়ার সাথে এদের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি তার।

অভিযুক্তদের বাড়িতে ও মুখোমুখি

এই তথ্যের পর টিম বাংলা এডিশন টিম এবার অভিযুক্ত খলিলুর রহমানের বাড়িতে যায়। খলিলুরকে পাওয়া না গেলেও মুখ খোলেন তার স্ত্রী ও সন্তান।

এসময় খলিলুরের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে কাওসার, তাদের পরিবারের চরম অভাব-অনটন ও দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।

স্থানীয়দের কথায় খলিলুরের পারিবারিক দুরবস্থার চিত্র ফুটে ওঠে। তবে, তার স্বভাব-চরিত্রে নেতিবাচক কোনো কিছু দেখেনি বলে জানায় স্থানীয়রা।

ঘটনার জট খুলতে, টিম বাংলা এডিশন এবার মুখোমুখি নাগেশ্বরী উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক ও অভিযুক্ত আলমগীর হোসেনের। এসময় দম্ভোক্তি করে তিনি হুমকি দেন, ভুক্তভুগীরা যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে তাদের বিপদ রয়েছে। সাথে তিনি যুক্ত থাকার বিষয়ে স্বিকার করেন অকপটে। আর এই ঘটনার পুরোটাই বন্দি হয় আমাদের গোপন ক্যামেরায়।

অন্যদিকে, জেলা এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান জুয়েল, লেনদেনের সময় সেখানে উপস্থিত থাকার কথা কথা স্বীকার করেন।

কেন্দ্রীয় নেতার প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দীয় যুগ্ম আহ্বায়ক ও কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে, ভুক্তভোগীর অভিযোগে ড. আতিক মুজাহিদের নাম উঠে আসায় তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, তার নাম ব্যবহার করায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে অভিযুক্তদের তলব করা হয়। পরে, উভয় পক্ষ বিষয়টি অস্বীকার করে বলে জানান তিনি।

এছাড়াও হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশট পাঠিয়ে, আতিক মুজাহিদ দাবি করেন, বাকি টাকা নাকি ভুক্তভোগীদের পরিশোধ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে, এনসিপি নেতা আতিক মুজাহিদ, এই প্রতিবেদন প্রকাশ না করার বার্তা দেন প্রতিবেদককে।

একপর্যায়ে প্রতিবেদনটি বন্ধ করতে রাজি না হওয়ায়, প্রতিবেদক ও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে টাকা দাবির ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ।

অন্যদিকে, এনসিপির এই নেতার দেয়া ওই স্ক্রিনশট দেখা যায়, শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) তারিখে চাকরীপ্রত্যাশিত ভুক্তভোগীর টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে পুরোটাই।

কিন্তু, ভুক্তভোগী নাঈমের তথ্যমতে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে তাকে সর্বশেষ টাকা পাঠানো হয়েছিল, বুধবার (২ সেপ্টেম্বর)।

দলীয় বহিষ্কার

এদিকে, অনুসন্ধান চলাকালে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ফুলবাড়ী উপজেলা যুগ্ম সদস্য সচিব খলিলুর রহমান এবং নাগেশ্বরী উপজেলা আহ্বায়ক আলমগীর হোসেনকে বহিষ্কার করে জাতীয় নাগরিক পার্টি কুড়িগ্রাম জেলা।

বহিষ্কারের বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা এনসিপির আহ্বায়ক মুকুল হোসেনের সাথে কথা বললে তিনি ভিন্ন অবস্থান নেন। কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি দাবি করে ঘটনাটিকে দলের ‘সাংগঠনিক অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে যান।

এছাড়াও, ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তিনি।

সেইসাথে, অভিযোগ মিথ্যা হলে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার উদ্যোগের কথাও জানান এনসিপির এই নেতা।

চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণার এই মহোৎসবে একে একে মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে বহু নেতার। কিন্তু দলীয় বহিষ্কার কি কেবলই ধামাচাপা দেয়ার কৌশল, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো সিন্ডিকেট? সাধারণ মানুষের সরলতা আর বেকারের স্বপ্ন নিয়ে এই মিথ্যা খেলা বন্ধ হবে কবে? উত্তরের অপেক্ষায় বাংলাদেশ।