শুক্রবার

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০ আশ্বিন, ১৪৩৩

কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের রাতে বাইরে নেওয়ার দাবি তানভীরের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:০৫

শেয়ার

কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের রাতে বাইরে নেওয়ার দাবি তানভীরের
ছবি সংগৃহীত

নির্যাতন ও চিকিৎসার নামে অজ্ঞাত ওষুধ দেওয়ার অভিযোগ এনসিপির সাবেক নেতার

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে অব্যাহতি পাওয়া যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর অভিযোগ করেছেন, কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাদের রাতে গাড়িতে করে বাইরে নেওয়া হতো এবং ভোরে আবার কারাগারে আনা হতো। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি দেখে ফেলাই তাঁর জন্য কাল হয়েছে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কারাগার ও রিমান্ডে নিজের ওপর অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলে এসব কথা বলেন তানভীর। অসুস্থতার কারণে তিনি কথা বলতে না পারায় তাঁর পক্ষে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।

কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিষয়ে অভিযোগ

লিখিত বক্তব্যে তানভীর বলেন, তাঁকে যে কক্ষে রাখা হয়েছিল সেখান থেকে কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের লোকজনের অবস্থান দেখা যেত। তাঁর দাবি, তারা ভালো অবস্থায় থাকতেন, ফোনে কথা বলতেন, ভালো খাবার খেতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতেন।

তানভীরের অভিযোগ, রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে কারাগারের বাইরে নেওয়া হতো এবং ভোরে আবার আনা হতো। তিনি নিজে বিষয়টি দেখেছেন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, এই বিষয়টি দেখার কারণেই হয়তো তাঁর ওপর নির্যাতন করা হয়েছে।

রিমান্ড ও কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ

তানভীর জানান, ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেল ও রিমান্ডে তাঁকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে এবং হুমকি দেওয়া হয়েছে। নির্যাতনের কথা বাইরে বললে তাঁর পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও দাবি করেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সরকারের মধ্যে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের কালো ছায়া এখনো রয়ে গেছে এবং কারাগারে গিয়ে তিনি এর প্রমাণ পেয়েছেন।

লিখিত বক্তব্যে তানভীর জানান, ২ আগস্ট সাইবার সুরক্ষা আইনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ৫ আগস্ট তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান ওই মামলার বাদী।

তাঁর দাবি, ৫ আগস্ট তাঁকে বগুড়া কারাগারের একটি অপরিচ্ছন্ন, আলো-বাতাসহীন সেলে রাখা হয়। সেখানে বিদ্যুৎ ও ফ্যান ছিল না। কারারক্ষীদের কয়েকজন তাঁকে জুলাই জঙ্গি বলে গালিগালাজ করতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। আশপাশের কয়েদিদের মধ্যেও আওয়ামী লীগের আসামি ছিলেন এবং তারাও তাঁকে বিভিন্নভাবে সম্বোধন করতেন বলে দাবি করেন।

তানভীর আরও বলেন, ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে অন্যদের ভালো খাবার দেওয়া হলেও তাঁকে দুই দিনের পচা খাবার দেওয়া হয়। পরে কারাগারেও পচা-বাসি খাবার দেওয়া হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।

চিকিৎসা ও অজ্ঞাত ইনজেকশন নিয়ে অভিযোগ

তানভীরের দাবি, একপর্যায়ে তাঁর ডায়রিয়া হয়। চিকিৎসার জন্য তাঁকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক যে ওষুধ লিখেছিলেন, তা তাঁকে দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে অজ্ঞাত ওষুধ খেতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর শরীরে অসংখ্য ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তানভীর। তাঁর ভাষ্য, অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং এসব কীসের ইনজেকশন তা তিনি জানতেন না। সারাক্ষণ জ্বর থাকত এবং তাঁকে ইনজেকশন দেওয়া হতো বলেও জানান তিনি।

তানভীর বলেন, একদিন হাত-পা কাঁপতে থাকলে চিকিৎসক তাঁকে ইনজেকশন দেন। এরপর তাঁর ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায়। পরে তাঁকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক স্ট্রোক হয়েছে বলে জানান বলে দাবি করেন তিনি। তবে কারা কর্তৃপক্ষ স্ট্রোক হয়নি বলে জানায় বলেও অভিযোগ করেন তানভীর।

তিনি জানান, তাঁর সিটি স্ক্যান করা হলেও এর রিপোর্ট সম্পর্কে তাঁকে জানানো হয়নি। পরে এমআরআই করানোর কথা বলা হয়। শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজের এমআরআই মেশিন নষ্ট থাকার কথা জানানো হলেও তাঁকে সেখানে মেশিনের ভেতরে নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। মেশিনের ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট শব্দ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায় এবং এরপর তাঁর কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে যায় বলে জানান তানভীর।

তাঁর দাবি, এরপর তিনি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অচেতন ছিলেন। জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজের প্রিজন সেলে দেখতে পান এবং তাঁর শরীরে প্রস্রাব-পায়খানা লেগে ছিল বলে জানান তিনি।

ঢাকায় নেওয়ার পরও নির্যাতনের অভিযোগ

তানভীর বলেন, পরে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। কেরানীগঞ্জে যে সেলে রাখা হয়েছিল, সেটিও খুব খারাপ ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। চিকিৎসার জন্য পিজি হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখান থেকে কারাগারে ফেরার সময় গাড়িতে সাদা পোশাকে কয়েকজন উঠে তাঁকে নির্যাতন করেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তাঁর অভিযোগ, নির্যাতনের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ এবং সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম উল্লেখ করে বলা হতো, জুলাইয়ের সবাইকে এভাবে নির্যাতন করা হবে।

বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তানভীর বলেন, তাঁর ওপর এতটাই নির্যাতন করা হয়েছে যে এখন তাঁকে প্রস্রাব-পায়খানা ব্যাগ ও প্যাডে করতে হচ্ছে। তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে বলে জানান।

গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও জামিন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর ও মানহানিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গত ৫ আগস্ট ঢাকার পূর্ব মনিপুর এলাকা থেকে তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ১০ আগস্ট তাঁকে এক দিনের রিমান্ডে নেয় বগুড়া সদর থানা পুলিশ।

রিমান্ডে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তানভীরকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।

বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনার দাবি জানান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর গুরুতর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গত ১ আগস্ট গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে দলের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয় এনসিপি।

এর আগে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিলও তানভীরকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছিল এনসিপি। তখন জেলা প্রশাসক নিয়োগে অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পাঠ্যবই ছাপার কাগজে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। সে বিষয়ে তাঁকে সাত দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁকে কেন দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। প্রায় এক বছর পর তাঁর সাময়িক অব্যাহতির আদেশ প্রত্যাহার করে এনসিপি।