সোমবার

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬ আশ্বিন, ১৪৩৩

আগুন সন্ত্রাস ও নাশকতার অভিযোগে ফের আলোচনায় আওয়ামী লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:২১

শেয়ার

আগুন সন্ত্রাস ও নাশকতার অভিযোগে ফের আলোচনায় আওয়ামী লীগ
ছবি বাংলা এডিশন

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন ও ঝটিকা মিছিলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের এসব ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ঐক্যের কথাও বলেছেন বিভিন্ন দলের নেতারা।

রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরপর তিনটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।

১১ সেপ্টেম্বর গুলশান-১ এলাকায় ঝটিকা মিছিলের চেষ্টাকালে বাধা দিলে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ও বোমা নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে এবং অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করে।

১৯ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী মোড় এলাকায় একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনের দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মের নির্জন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে কাফরুল থানার সামনে মিরপুর সুপার লিংক পরিবহনের একটি ফাঁকা বাসেও আগুন দেওয়া হয়।

২০ সেপ্টেম্বর সকালে রাজধানীর পল্লবীর ১২ নম্বর সিরামিক রোডে পরিস্থান পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। একইদিন দুপুরে হাইকোর্টের সামনের সড়কে একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছে।

প্রায় একই সময়ে শিল্পকলা একাডেমির সামনের সড়কেও একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও কাউকে আটকের খবর পাওয়া যায়নি।

এর আগে শুক্রবার জুমার নামাজের পর মালিবাগের সোহাগ বাস কাউন্টারের সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একইদিন সন্ধ্যায় আগারগাঁওয়ে বেতার ভবনের সামনে, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মহাখালী এলাকায়, রাত ৮টার দিকে বাবুবাজার ব্রিজের নিচে এবং রাত ৯টার দিকে মগবাজার মোড়ে একটি করে ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার প্রধান ফটকের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। কিছুক্ষণ পর যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে আরও তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে ইবাদুর রহমান নামে এক অটোচালক আহত হন।

এ ছাড়া রাত ১১টার দিকে রামপুরা বিটিভি ভবনের সামনে দুটি এবং রাত ১২টার দিকে নিউ মার্কেট এলাকার ঢাকা কলেজের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

ঢাকার বাইরেও অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরণ

১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ফরিদপুর সদরের করিমপুর হাইওয়ে থানার সামনে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে রাখা পূর্বাশা পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। দুর্ঘটনার পর বাসটি পুলিশের হেফাজতে ছিল। আগুনে বাসটির অধিকাংশ পুড়ে যায়। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা দাবি করেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

২০ সেপ্টেম্বর ভোরে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোপালচরণ এলাকায় তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবু সোলাইমান সরকারের বাড়ির সামনে, গোপালচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে এবং বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশের সড়কে এসব বিস্ফোরণ ঘটে।

স্থানীয়দের দাবি, বিস্ফোরণের সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শোনা গেছে।

আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশের অভিযোগ ডিবির

রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলো বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নির্দেশনায় ঘটানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবির এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বংশাল এলাকার একটি ইউনিটের দপ্তর সম্পাদকসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার রায়হান উদ্দিন বংশাল এলাকার ৬ নম্বর ইউনিট আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক। অপর তিনজন হলেন আলাউদ্দিন, রাসেল খান ও আব্দুল্লাহ।

ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মো. শাহীন বলেন, গত শুক্রবার যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে রায়হান উদ্দিনকে শনাক্ত করা হয়। পরে শনিবার রাতে লালবাগ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। পরে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

রাজনৈতিক ঐকমত্যের তাগিদ

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের মতো দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে রয়েছেন এবং আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও সেখানে অবস্থান করছেন। তার দাবি, আওয়ামী লীগের নিজস্ব কোনো রাজনীতি ছিল না এবং তারা সবসময় ভারতের রাজনীতি অনুসরণ করেছে।

ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগের আগুন সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দলটিকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিভিন্ন দলের নেতাদের বক্তব্য

সাম্প্রতিক সময়ে যানবাহনে আগুন ও ককটেল নিক্ষেপের ঘটনাকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে বিভিন্ন দলের নেতারা রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে রাতের অন্ধকারে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এবং চালক ও হেলপারবিহীন অবস্থায় পার্ক করে রাখা কয়েকটি বাসে আগুন দিয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তাদের পুরোনো কর্মকাণ্ডে ফিরে আসছে। তার অভিযোগ, দলটি আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে আবার মানুষকে জিম্মি করতে চাইছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী রোববার বলেন, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে ১০ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগরীর নেতাদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা এবং দলটির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। এ লক্ষ্যে ২৪ ঘণ্টা রাজনৈতিক মাঠে বিএনপির নেতাকর্মীদের শক্ত অবস্থানে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান রিজভী।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে এখনো কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তার অভিযোগ, দলটির নেতারা বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো কর্মকাণ্ড করছেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ জ্বালাও-পোড়াও ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনীতি করেছে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আবারও দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে তিনি মনে করেন। আওয়ামী লীগের এমন কর্মকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোরভাবে মোকাবিলার আহ্বান জানান তিনি। প্রয়োজন হলে আওয়ামী লীগকে প্রতিরোধে বিরোধী দল ও এনসিপির পক্ষ থেকে সহযোগিতার কথাও বলেন তিনি।

এনসিপির পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চরিত্র আর অক্ষুণ্ণ নেই বলে তিনি মনে করেন। তার অভিযোগ, দলটি পাশের দেশের আশ্রয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। জ্বালাও-পোড়াও ও নাশকতার মাধ্যমে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।